রানু আপার স্বপ্ন

আবু হাসানাত মোঃ ছফিরুল ইসলাম

ব্যাচঃ নবম

শাখাঃ এ্যারোস্পেস

গ্রামের নাম শিমুলতলী৤ রানু আপা এই গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা৤ সরকারি ছুটির দিনগুলো বাদে তিনি প্রতিদিন স্কুলে পড়াতে যান৤  বিদ্যালয়ের শ্রেনীকক্ষগুলোতে ছাত্র ছাত্রীদের উপস্থিতি খুবই কম৤  তার প্রধান কারন গ্রামের মানুষগুলো অশিক্ষিত কুসংস্কারে আচ্ছন্ন৤  তার চেয়েও বড় কারন তাদের আর্থিক দূরাবস্থা৤  তারা তাদের ছেলেমেয়েদের দিয়ে শ্রম খাটাবে৤  স্কুলে ছেলেদের উপস্থিতির তুলনায় মেয়েদের উপস্হিতি নেই বললেই চলে৤ অভিভাবকদের অনেকেই বলে স্কুলে গেলে কি পেটে খাওন জুটব? তার চেয়ে কাম কর দু’মুঠো খেয়ে বাঁচতে পারবি৤ এ কথাগুলো শিক্ষিকা রানুকে খুবই কষ্ট দেয়৤  তিনি বুঝতে পারেন মানুষগুলো অজ্ঞতা আর মূর্খতার চরম সীমায় পৌছে গেছে৤

আজ রানু আপার সুকুল নিধারিত সময়ের আগে ছুটি হয়েছে৤ বাড়ি ফেরার পথে তিনি ভাবতে লাগলেন, কি করাপ যায়? তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, বিকেলে ছাত্রীদের বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের সাথে কথা বলবেন৤ মেয়েদের স্কুলে আসা যদি একসময় বন্ধ হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম অন্ধকারের অতল গহবরে তলিয়ে যাবে৤ তিনি মনে প্রানে বিশ্বাস করেন শিক্ষা ছাড়া নারী জাতির মুক্তি নাই৤ তিনি শাড়ি আচল দিয়ে চশমার ফ্রেমটা মুছতে মুছতে চলছেন৤ শরতের আকাশে সাদা ঘেগুলো তুলোর মত ভেসে যাচ্ছে৤ কখন আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি নামবে বলা যায় না৤

রানু আপা হাতের তালিকা থেকে ঠিক করলেন প্রথমেই রাজিয়াদের বাড়িতে যাবেন৤ রাজিয়া, রানু আপার স্কুলের পঞ্চম শ্রেনীর শেধাবী ছাত্রী কিন্তু মাসখানেক হয়ে গেল রাজিয়া স্কুলে যাচ্ছেনা৤ রাজিয়ার বাবা বাড়িতে নেই৤ রাজিয়ার মা এসে বললেন, আফা ভাল আছেন? রানু আপা হাসিমুখে উত্তর দিলেন, ভালো আছি কাকি৤ রাজিয়ার মা মোড়া এগিয়ে দিলেন বাসার জন্য৤ রানু আপা জিঙ্গেস করলেন, রাজিয়া কোথায়? তাকে দেখছি নাতো৤ রাজিয়া লজ্জায় কাছে আসতে পারছে না৤ রাজিয়ার জন্য রাজিয়ার বাবা বিয়ে ঠিক করেছে৤ সে কি বলবে আপাকে? কেন সে স্কুলে যাচ্ছে না? রাজিয়ার অনেক স্বপ্ন ছিল৤ সে পড়ালেখা করে শহরে বড় চাকরি করবে৤ সে কি পারবে তার স্বপ্ন পূরন করতে? এ কথাগুলো ভাবতেই সে কেঁদে ফেলল৤ রাজিয়ার কান্না আরো বেড়ে গেল৤ রানু আপা রাজিয়াকে বুকে চেপে কান্না  থামানোর চেষ্টা করলেন৤ রাজিয়ার কান্না দেখে রানু আপারও দু’চোখ ভিজে গেল৤ রানু আপা জিঙ্গেস করলেন, কি হয়েছে তোমার? তুমি স্কুলে যাচ্ছ না কেন? ততক্ষনে রাজিয়ার বাবা এসে গেছে৤ তিনি বললেন, মাইয়্যা মানুষগুলো পড়ালেহা কইরা কি অইব? তাছাড়া যতক্ষন পড়ালেখা করব ততক্ষন কাম কাজ করলে সংসারের উন্নতি অইব৤ পড়া লেহা করাইলে ট্যাহা-পয়সাও লাগে মেলা৤ আব সবার পড়ার দরকার কি? রাজিয়ার লাইগ্যা আমি বিয়া ঠিক করছি৤ এতক্ষন রানু আপা চুপ করে কথাগুলো শুনছিলেন৤ শেষের কথাটা শুনে তিনি আকাশ থেকে পড়লেন৤ আর চুপ করে থাকা যায় না৤ এবার রানু আপা মুখ খুললেন, চাচা আপনি যা বলেছেন সব ভুল৤ রাজিয়া পাড়ালেখা করলে আপনার সংসারের কোন ক্ষতি হবে না৤ আপনার টাকা পয়সাও খরচ হবে না৤ মেয়েদের বিনা বেতনে ও বইপত্র দিয়ে পড়ালেখার সুযোগ দিচ্ছে৤ উচ্চ শিক্ষার জন্য রয়েছে বিভিন্ন বৃত্তির ব্যবস্থা৤ সরকারের পাশাপাশি দেশি-বিদেশী অনেক সংস্থা ছেলেমেয়েদের মানসম্মত ও যুগোপোযোগী পড়ালেখার সুযোগ দিচ্ছে বিনা খরচে৤ চাচা, আমাদের সমাজের মেয়েরা অবেহেলিত৤ মেয়েদেরকে পারিবার ও সমাজের বোঝা মনে করা হয়৤ পড়ালেখা করে মেয়েরাও স্বাবলম্বী হতে পারে৤ অবদান রাখতে পারে নিজের পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে৤ মনে রাখবেন, শিক্ষিত মেয়ে বোঝা নয়, সম্পদ৤ চাচা, আপনি রাজিয়ার বিয়ে কেন ঠিক করেছেন? তার কি বিয়ের বয়স হয়েছে? রানু আপা একটু উত্তেজিত হয়ে কথাগুলো বলবেন৤ রাজিয়ার বাবার মুখে কোন কথা নেই৤ কথা নেই তাদের মুখেও যারা রানু আপাকে ঘিরে কথাগুলো শুনছিল৤ সবাই মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে৤ রাজিয়া তুমি কাল থেকে স্কুলে যাবে৤ এ কথা বলে রানু আপা চলে গেলেন৤ রানু আপার কথা শুনতে আসা আশেপাশের মানুষগুলো যার যার বাড়ির দিকে রওয়ানা হল৤

সন্ধ্যা হয়ে আসছে চারদিকে৤ রাজিয়ার মা রান্নাঘর থেকে ডাক ছাড়ে, রাজিয়া ঘরে বাতি দে৤ রাজিয়া কেরোসিনের কুপিটা ন্যাকড়া দিয়ে মুছে আগুন ধরায়৤ হঠাৎ এক ঝটকা বাতাসে কুপিটা নিভে যায়৤ আইরে ঝড় হচ্ছে৤ ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত৤ মাঝে মাঝে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে৤ রাজিয়া কুপি জ্বালিয়ে পড়ছে৤ অনেকদিন পড় কাল সে স্কুলে যাবে ভাবতেই ভাল লাগছে তার৤ বইয়ের দিকে তাকিয়ে তার রানু আপার কথা মনে পড়ে৤ স্কুলে ভাল ফলাফলের কারনে রানু আপা তাকে অনেক আদর করত৤ রাজিয়া আনন্দে আপন মনে বলে ফেলে আমি স্কুলে যাব৤ ভালোমতো পড়ালেখা করে রানু আপার চেয়ে বড় আপা হব৤ ওপাশ থেকে রাজিয়ার বাবা বলে উঠে অহনও বাতি জ্বালাই রাখছস ? রাজিয়া বাতি নিভিয়ে দিয়ে ‍শুয়ে পড়ে৤ শুয়ে শুয়ে সে তার স্কুল, স্যার, আপা, পাশের বাড়ির মনি, রাজু, মালার কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয় পড়ে৤ গায়ের কাঁথা সরে যাওয়ায় ঠান্ডার কারনে খুব ভোরেই ঘুম ভাঙে রাজিয়ার৤

 

কিছুদিন পর

স্কুলে রাজিয়া তার সহপাঠীদের সাথে কথা বলছে৤ রানু আপা পিছন থেকে ডাক দেয় রাজিয়া৤ রাজিয়া পিছনে তাকায় জ্বি আপা স্কুল ছুটি হলে তুমি আমার সাথে বাড়ি যাবে৤ তোমার সাথে কথা আছে৤ রাজিয়াদের বাড়ি থেকে একটু দূরে রানু আপার বাড়ি৤ যাওয়ার রাস্তা একটাই৤ রাজিয়া ও রানু আপা পাশাপাশি হাটছে৤ রাস্তার দু’পাশের ফসলগুলো বাতাসে দুল খাচ্ছে৤ শোন রাজিয়া, তোমার ফাইনাল পরীক্ষা কিন্তু বেশি দূরে নেই৤ প্রতিদিন স্কুলে আসবে আর বাড়িতে ভালভাবে পড়াশোনা করবে৤ সরকারি বৃত্তি পরীক্ষার জন্য তোমার নাম রেজিষ্ট্রেশন করেছি৤ একটা কথা মনে রাখবে, চেষ্টা আর পরিশ্রম ব্যতীত কোন সাফল্যই অজন হয় না৤ আমি সব সময় তোমার পাশে আছি৤ তোমার যে কোন সমস্যার কথা আমাকে জানাবে৤ রাজিয়া বুঝতে পারে রানু আপা তাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখে৤ রাজিয়া ঘাড় কাত করে রানু আপার কথায় সম্মতি দেয়৤

বৃত্তি পরীক্ষার পূর্বের রাত৤ রাজিয়া পড়ছে৤ ছনের বেড়ার ফাক দিয়ে আসা বাতাস কুপিটাকে নিভিয়ে দিতে চাচ্ছে৤ রাজিয়ার এখানো অনেকগুলো পড়া রিভিশন দেওয়ার বাকি৤ থেমে থেমে ঝি ঝি পোকা ডাকছে৤ দুরের কোন গৃহস্থের বাড়ি থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে৤ রাজ্যের সব ঘুম রাজিয়ার দু’চোখে ভর করছে৤ তবুও তার ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না৤ তাকে তার পড়া শেষ করতেই হবে, তা না হলে সে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না৤ রাজিয়া ক্লান্ত হয়ে গেছে৤ কুপিটার তেজও কমে গেছে, মনে হচ্ছে তেল ফুরিয়ে আসছে৤ মুয়াজ্জিনের আযানের ডাকে ঘুম ভাঙে রাজিয়ার৤ কখন যে টেবিলে ঘুমিয়ে পড়েছিল মনে করতে পারছে না৤ কুপিটাও তেল শেষ হওয়াই নিভে গিয়েছিল৤

রাজিয়া প্ঞ্চম শ্রেনীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়৤ ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য নির্বঅচিত হয় সে৤ রাজিয়ার মা বাবা কিছুতেই মেয়েকে শহরে ভর্তি করাতে চান না৤ রানু৤ আপা তাদের বুঝিয়ে বলেন, আমি রাজিয়াকে দেখব৤ ও অনেক মেধাবী আর বুদ্ধিমান৤ রাজিয়া পরিশ্রম করতে জানে৤ সে একদিন বড় হয়ে দেশের সমাজের ও জাতির গব হবে৤ রানু আপার পাশে দাড়িয়ে শোনা এই কথাগুলো আজ বারবার মনে পড়ছে রাজিয়ার৤ রানু আপার স্বপ্ন পূরন হয়েছে৤ রাজিয়া আজ অনেক বড় ডাক্তার হয়েছে৤ স্কুল, কলেজে ভাল ফলাফল এবং ডাক্তারি পড়ার পিছনে রানু আপার অবদান সে কোনদিন ভুলতে পারবে না৤ আজ রানু আপা নেই৤ সড়ক দূঘটনায় — মনে করতেই রাজিয়া হু হু করে কেঁদে ফেলল৤ রাজিয়া হাত তুলে বলল, হে আল্লাহ আপনি রানু আপাকে জান্নাতবাসী করুন৤ কবরের চারপাশে দেওয়া বাঁশের কঞ্চির বেড়াটা স্থানে স্থানে ভেঙে গেছে৤ কবরের উপরের বুনো সবুজ ঘাসগুলো সন্ধ্যার আঁধারে অস্পষ্ট হয়ে আসছে৤ রাজিয়া সিক্ত নয়নে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কবরের দিকে৤