থ্রিলার :: ” Point of View “

লেখক ::

আব্দুল আহাদ খান মাশুক (মাশুক খান)

৮ম ব্যাচ, এভিউনিকস

এক.

এক রাশ ধোঁয়া উঠছে রাস্তার আবর্জনা থেকে । শীতার্ত কিছু মানুষ শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে আবর্জনায় ধরানো আগুন থেকে উত্তাপ নিচ্ছে । রাত এগারটা আটচল্লিশ বাজে । বেশ রাতই বলা যায় এখন । যদিও শহর অঞ্চলে এটা কোন রাতই না । মেইন রোডে, ঠিক রেল লাইনের পাশে একটা লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে । পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি লম্বা বেশ শক্তিশালী বত্রিশ বছর বয়সী বিশেষত্ববিহীন এক চেহারা । এই ধরনের চেহারার লোকের চেহারা মনে রাখা বেশ কষ্টকর । কারণ এ ধরনের চেহারা আমার অহরহ দেখি পথেঘাটে । তবে লোকটার চোখজোড়া ঠিক যেন চেহারার সাথে যায় না । অন্ধকারেও যেন হিংস্র শ্বাপদের মত জ্বলজ্বল করছে তার চোখজোড়া । লোকটার নাম মাসুদ ফেরদৌস ঈশান । ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের উচ্চপদস্থ অফিসার । ঈশানের যদিও ঠিক এখানে কোন কাজ নেই । তবে সে এখানে কোন কাজের প্রয়োজনেও দাঁড়িয়ে নেই । এ মূহুর্তে সে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে । ঈশান ডান দিকে কিছুটা দূরে একটা লোকের দিকে তাকিয়ে রয়েছে । অনেকক্ষণ ধরে সে তাকিয়ে দেখছে লোকটাকে । এখানে এসে ঈশান দাড়ানোর কিছুক্ষণ পরে , বলা যায় সাথে সাথেই লোকটা এসে দাড়িয়েছে সেখানে । লোকটার ভাবভঙ্গি সুবিধার লাগছে না ঈশানের কাছে । স্বাভাবিক না হওয়ার যদিও কোন কারণ দেখছে না ঈশান । তবে একঠায় এভাবে  দাড়িয়ে থাকাটাই হয়তো অস্বস্তির জাগিয়েছে তার মনে । পকেট থেকে মোবাইল বের করে সময়টা দেখলো ঈশান । সময়টা দেখে সোজা হয়ে তাকাতেই লক্ষ করলো লোকটা এগিয়ে আসছে তার দিকে । ছিনতাইকারী নাকি ? ভাবছে ঈশান । তবে ছিনতাইকারীরা সাধারণত একা ছিনতাই করে না । সাধারণত দলে দুই তিনজন থাকে । এদিকে ওদিকে তাকিয়ে লোকটার সাথে কেউ রয়েছে কিনা নিশ্চিত করলো ঈশান । না কেউ রয়েছে এমনটা মনে হচ্ছে না । লোকটা একটা হাত পকেটে ঢুকিয়ে ঈশানের দিকে এগিয়ে আসলো । অর্থাৎ ঈশানের ধারনাই ঠিক । লোকটা তাকে অনুসরণ করছে । ঈশান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে হাতের দিকে । মনে মনে অস্ত্র আশা করলেও সেটা হয়নি এবার । হাতে একটা মোবাইল দেখা যাচ্ছে । লোকটা আরো কাছে এসে মোবাইলটা তার দিকে এগিয়ে দিলো ।

– আপনার কল এসেছে ঈশান সাহেব ।

– কে কথা বলতে চাচ্ছে ?

– কথা বলুন । আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন । কথা না বাড়িয়ে মোবাইলটা কানে চেপে ধরলো ঈশান । কানে স্পর্শ করার সাথে সাথে বয়স্ক এক কন্ঠস্বর ভেসে আসলো । ঈশান বুঝতে পারছে তাকে লক্ষ করা হচ্ছে । কারণ সে কথা এখনো বলেনি তার আগেই কথা বলতে শুরু করেছে অপর প্রান্ত থেকে ।

– হ্যালো ঈশান সাহেব । কেমন আছেন ?

– কার সাথে কথা বলছি আমি ?

– আপনি অলরেডী জানেন কার সাথে কথা বলছেন । যদিও মোবাইলে প্রাইভেট নম্বর শো করছে ।

– তা তো বটেই । তো কি বলে আপনাকে সম্মোধন করবো ? বার্ড নেস্টের লিডার , নাম ধরে না অন্য কিছু ?

– সম্মোধন করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু না । তাছাড়া কথা বলতে সবসময় সম্বোধন করার প্রয়োজন হয় না ।

– তো আমার আমার কাছে কি চাই ?

– আপনি বেশ ভালো করে জানেন কি দরকার । নাহিদকে আমার দরকার । সেন্ট্রাল জেল এ এখন সে রয়েছে তাই নয় কি ? আর তার কাছেই তো আপনি এখন দেখা করতে যাচ্ছেন ।

– আমি কেন সাহায্য করবো ?

– নাফিজ আর স্ত্রী কি করছে ? ঈশানের শরীর শক্ত হয়ে আসছে মনে হচ্ছে । তার ছোট ভাই নাফিজ এখন কি করছে এর সাথে এখনের সম্পর্ক কি ? এরা কি তাদের অপহরণ করছে ? বাসা থেকে কিছুক্ষন আগে বের আসার আগে তাদের কে নিজেদের রুমে ঘুমাতে দেখে এসেছে । নাফিজ আজকাল বাসায় থাকে সবসময় । কারন তার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট । আট মাস চলছে নাফিজের স্ত্রী । কয়েক মূহুর্তে বিরতি নিয়ে আবার কথা বলতে শুরু করলো অপর প্রান্ত দিয়ে । আপনার বাড়িটা বেশ সুন্দর বলা যায় । দুইতলা তিন ইউনিট নিয়ে বেশ রুচিশীল ডিজাইনের বিল্ডিং । তবে আপনি যদি আমার কথা না শুনেন তাহলে হয়তো সেটা আর রুচিশীল থাকবে না । ছয়টা এক্সপ্লোসিভ প্লান্ট করা রয়েছে এ মূহুর্তে বিল্ডিং টায় । যদিও দুইটা এক্সপ্লোসিভ বিল্ডিং উড়ানোর জন্য যথেষ্ট । তবে এতগুলো এক্সপ্লোসিভ নষ্ট করার একটাই কারন । যদিও কোন কারনে এক্সপ্লোসিভ গুলো বিল্ডিং থেকে খুঁজে বের করতে পারেন অন্যগুলো যাতে কাজ চালিয়ে দিতে পারে । আর হ্যাঁ, এক্সপ্লোসিভ গুলো রেডিও একটিভ । তো যদি নাফিজ আর তার স্ত্রী বের হতে চেষ্টা করে বিল্ডিং থেকে সাথে সাথে উড়িয়ে দেওয়া হবে ।

– আমার কি করতে হবে ? ক্লান্ত গলায় বললো ঈশান ।

– আপাতত নাহিদ কে বের করে আনবেন জেল থেকে ।

– আমাকে কেন আনতে দিবে সেখানে থেকে ?

– আপনার সেই ক্ষমতা আছে তাই না ? তাছাড়া দূর্নীতি তো এদেশের সর্বস্তরে রয়েছে তাই না ? তাই বলা যায় খুব ঝামেলা না এটা আপনার জন্য । বলা যায় একেবারে সহজ । আমেরিকানদের ভাষায় বলা যায় পিস অফ কেক । কথাটা বলে অপর প্রান্ত থেকে হাসতে শুরু করলো । ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছে যেন খুব হাসির কোন কথা বলেছে । কথা বলা শেষ হয়নি এখনো অপর প্রান্তের । আপনার সাথে ইকবাল যাবে । সম্পূর্ণ পথে সে আপনার সাথে থাকবে । সে খেয়াল রাখবে যেন আপনি বিপদজনক কিছু না করতে পারেন । ঝামেলা করলে ফলাফল কি হতে পারে এটা আপনার অজানা না ।

– হু… ঈশান জবাব দিলো । আপাতত তার কিছুই করার নেই এদের কথা শোনা ছাড়া । যদি না শোনে তাহলে কি করবে এরা বুঝতে খুব অসুবিধা হচ্ছে না । মোবাইলটা ইকবাল নামের লোকটার দিকে এগিয়ে দিলো ঈশান । ইকবাল হাতে নিয়ে মোবাইলটা পকেটে রেখে দিলো । ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছে কি হবে সে ভালোভাবেই জানে । কয়েক মিনিট পরে ঈশান কে নিতে একটা গাড়ি এসে থামলো । কোন কথা না বলে ঈশান গাড়িতে চেপে বসলো । ঈশানের পাশে ইকবাল নামের লোকটিও চেপে বসলো । গাড়ির ভেতরে আসার পর ইকবালের চেহারাটা এই প্রথম পরিষ্কার দেখলো ঈশান । পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের বেশি কোনভাবেই হবে না ছেলেটার বয়স । হয়তো আরো কম হবে বয়স । এই বয়সে এ ধরনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত কিভাবে হয়েছে ছেলেটা ভাবছে ঈশান । পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগলো ঈশানদের সেন্ট্রাল জেলে পৌছাতে । গাড়ি থেকে ঈশান আর ইকবাল একসাথেই বের হয়ে আসলো । গাড়ি থেকে নামার পর ইকবাল প্রথম কথা বললো ।

– ঈশান সাহেব । আপনার সেলফোন দিন তো । একটা দিচ্ছেন যে ? অন্যটা কে দিবে ? দুইটা দিন তো । আর হ্যাঁ ওয়্যারলেসটাও দিন । কোন কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে দিলো ঈশান । ঈশান ভালোভাবেই বুঝতে পারছে এরা তার সম্পর্কে ভালোভাবেই খোঁজ নিয়ে এসেছে । কারন তা না হলে এদের জানার কথা না সে দুইটা মোবাইল ব্যবহার করে । আধাঘন্টা পরে ঈশান নাহিদ কে নিয়ে বের হয়ে আসলো সেন্ট্রাল জেল থেকে । পুরো সময় ইকবাল নামের ছেলেটা ঈশানের সাথে আটার মত লেগে ছিলো । বারবার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো ঈশান । একবার সুযোগ পাওয়া যদি যেত কোনভাবে অফিসের সাথে যোগাযোগ করার । তবে ইকবাল নামের ছেলেটার বয়স কম হলেও কাজে বেশ দক্ষ বুঝতে পারছে ঈশান । কোন সুযোগ দেয়নি তাকে । এখন শহর ছেড়ে তারা এগিয়ে চলছে । গাড়ি নিরিবিলি একটা এলাকায় এসে থামলো । নাহিদ খুব আনন্দে আছে মনে হচ্ছে । জেল থেকে বেরিয়ে পুরো রাস্তায় গান তার গলায় ছিলো, একটার পর একটা ননস্টপ । এ মূহুর্তে সে একমনে একটা গান গাইছে ।

” তবু এই দেয়ালের শরীরে যত ছেড়া রং, ধুয়ে যাওয়া মানুষ

পেশাদার প্রতিহিংসা তোমার চেতনার যতো উদ্ভাসিত আলো রং

আকাশের মতন অকস্মাত, নীল নীলে ডুবে থাকা তোমার প্রিয় কোন মুখ

তার চোখের কাছাকাছি এসে কেন পথ ভেঙে……… ”

মনে মনে ঈশান স্বীকার করছে নাহিদের গানের গলা বেশ ভালো । এবং সুর সম্পর্কে বেশ ভালো জ্ঞান রয়েছে নাহিদের । গাড়ি থেকে ঈশানকে বের হতে বললো ইকবাল । সাথে সাথে সে নিজেও নাহিদ কে নিয়ে বের হয়ে আসলো । ঈশান এখন ইকবালের কথা মত চলছে রাস্তায় । কারন এছাড়া আপাতত তার কোন উপায় নেই । ছেলেটা কাজ বুঝে । এর সাথে ঝামেলা না করলেই ভালো হবে । হঠাৎ কাছাকাছি গুলির শব্দ শুনে ঈশান বসে পরলো । কয়েক মূহুর্তে আগেও নাহিদের কন্ঠে গান চলছিলো । গুলির সাথে সাথে সাথে সেটাও থেমে গিয়েছে । গুলির শব্দটি পিছনে থেকে এসেছে । মাথা ঘুরিয়ে শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে ঈশান চমকে উঠলো । নাহিদ মাথা থুবড়ে পরে রয়েছে মাটিয়ে । আর ইকবাল হাতে একটা অস্ত্র নিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে । ঈশান অবাক হতে তাকিয়ে রয়েছে ইকবালের দিকে । নাহিদ কে যদি খুন করবেই তাহলে এত কাহিনী করে এখানে নিয়ে আসার দরকার কি ছিলো । ঈশান বুঝতে পারছে নাহিদের মৃত্যু তার উপর আরো বিপদ আনবে । হয়তো সে পুরোপুরি ফেঁসে যাবে নাহিদ খুন হওয়ার জন্য । এক মূহুর্তে ঈশান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো । সাথে সাথে ঝাপিয়ে পরলো ইকবাল উপর । ইকবাল হয়তো এটার জন্য প্রস্তুত ছিলো । লাফ দিয়ে দ্রুত সে জায়গা পরিবর্তন করে অস্ত্রটা ঈশানের দিকে তাক করলো । তবে শেষ রক্ষা আর হলো না । ঈশান তার ছয় ইঞ্চি ফলা বিশিষ্ট ছুরিটা ইকবালের হৃদপিণ্ড বরাবর থ্রো করলো । নিখুঁত লক্ষে ছুরিটা গেথে গিয়েছে । ইকবাল অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে এ মূহুর্তে তার হৃদপিণ্ডে গেথে থাকা নাইফটার দিকে । তার পৃথিবীর সব রহস্য যেন সেখানে জমা হয়েছে । ইকবাল যেন তার হাতের অস্ত্রটার কথা ভুলে গিয়েছে । সাথে যেন ঈশানের উপস্থিতি সম্পর্কে সে অনাগ্রহী । কয়েক সেকেন্ড পরে ইকবাল মাটিতে লুটিয়ে পরলো । এর মধ্যে দুইবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছে ঈশান । ইকবাল লুটিয়ে পরার সাথে সাথে এগিয়ে এসে ইকবালের অস্ত্রটা লাথি দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো । কয়েক সেকেন্ড পর সেখানে থেকে এগিয়ে নাহিদের কাছে আসলো ঈশান । পালস চেক করে বুঝলো কিছু করার নেই । ইকবালের পকেট থেকে দ্রুত নিজের মোবাইল আর ওয়্যারলেস উদ্ধার করে অফিসে যোগাযোগ করলো ঈশান । অল্প কথায় পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে লোক পাঠাতে বললো সে । কথা শেষ এমন মূহুর্তে ইকবালের পকেটে থাকা ইকবালের মোবাইল বেজে উঠলো । পকেট থেকে মোবাইল বের করে ডিসপ্লের দিকে তাকালো ঈশান । প্রাইভেট নম্বর দেখাচ্ছে । কয়েক মূহুর্ত ভেবে রিসিভ করে সেলফোনটা কানে চেপে ধরলো ঈশান । সাথে সাথে রেকর্ডিং অন করে দিলো তার নিজের মোবাইল থেকে । এটা হয়তো তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সাহায্য করবে । নাহলে তো পুরোপুরি ফেঁসে যেতে হবে ঈশানের ।

– হ্যালো ঈশান সাহেব, আপনি কাজটা ঠিক করেননি । আপনি কিভাবে ভাবলেন আমরা ইকবাল আর আপনার উপর লক্ষ করছিনা ? আমরা যদি চাই তাহলে এ মূহুর্তে আপনাকে মার্ডার করতে পারি । তবে আপনাকে খুন করবো না । যাই হোক আপনি আপনার ছোট ভাইয়ের সাথে শেষ কথা বলে নিন । কথাটা বলে কল কেটে দিলো অপর প্রান্ত থেকে । ঈশান দ্রুতগতিতে বাসায় কল করলো । কয়েকবার রিং হওয়ার পর নাফিজ রিসিভ করলো,

– নাফিজ তুই দ্রুত তোর বউকে নিয়ে বাসা থেকে বের হ । দ্রুত ।

– কেন কি হইছে ? এত রাত বিরাতে তুমি বৃষ্টি কে নিয়ে বের হতে বলছো তোমার মাথা ঠিক আছে ? বৃষ্টির এ মূহুর্তে বেশি নড়াচড়া করা উচিত না এটা তুমি কি বুঝো না ?

– যেটা বলছি সেটা কর । আর লাইন কাটিস না । বাড়িতে এক্সপ্লোসিভ প্লান্ট করা হয়েছে । কয়েক সেকেন্ড অপর প্রান্ত থেকে কোন কথা শোন গেল না ।

– এখুনি বের হচ্ছি ভাইয়া । তুমি লাইনে থাকো । ঈশান তার কান মোবাইলের সাথে লাগিয়ে রেখেছে । শুনতে পাচ্ছে স্পষ্ট নাফিজ তার স্ত্রী বৃষ্টি কে ঢেকে যাচ্ছে ঘুম থেকে ওঠানোর জন্য । তারপর হঠাৎ করে সব চুপচাপ । কি হচ্ছে কয়েকমূহুর্তে লাগলো ঈশানের বুঝতে । লাইন কেটে গিয়েছে । ধক করে ঈশানের বুকে হৃদপিণ্ড একটা চাপ দিলো । কি কারনে কল কেটেছে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না ঈশানের । আবার কল করলো সে নাফিজের মোবাইলে । যান্ত্রিক কন্ঠস্বর বলছে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না । ঈশান জানে আর কোনদিন এই নম্বরে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবেনা । তারপরও একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছে সে ।

 

দুই.

বারোদিন হয়ে গিয়েছে । ঈশান এ মূহুর্তে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের অফিসে বসে রয়েছে । গত কয়েকদিনে তার বয়স দশ বছর যেন বেড়ে গিয়েছে । ক্লান্ত ভঙ্গিতে কুঁজো হয়ে নিজের ডেস্কে বসে রয়েছে সে । আজকে তাকে দেখা করতে বলেছে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের প্রধান ফজলুল করিম । কিছুক্ষণ পরে ডাক পরতেই ফজলুল করিমের রুমে প্রবেশ করলো ঈশান । ছিমছাম রুচিশীল একটা রুম বলা যায় । অন্য সময় এ রুমে প্রবেশ করলে চারপাশটা তাকিয়ে দেখতো ঈশান । তবে এ মূহুর্তে সে কিছুই করছে না । ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের প্রধান ফজলুল করিম হাতে দুইটা ফাইল নিয়ে দ্রুত উল্টিয়ে যাচ্ছে । পাঁচ মিনিট পরে সে ঈশানের দিকে নজর দিলো । কয়েক মূহুর্ত তার দিকে তাকিয়ে ফজলুল করিম ড্রয়ার খুলে সিগারেটের প্যাকেট আর একটা সবুজ কালারের ফাইল বের করলো । সবুজ কালারের ফাইলটা এগিয়ে দিলো সে ঈশানের দিকে । ঈশানের মধ্যে প্রানের কোন চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে না । সে ফাইলটা এখনো ছুঁয়ে দেখেনি ।

– ফাইলটা পড়ে দেখো ঈশান । কথাটা শোনার অপেক্ষায় ছিলো যেন ঈশান । কোন কথা না বলে সে ফাইলটা নিজের হাতে তুলে নিলো । ফাইলের উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে বার্ড নেস্ট । ঈশান বুঝতে পারছে এটাতে বার্ড নেস্ট সম্পর্কে সব তথ্য রয়েছে । পড়তে শুরু করলো ঈশান ।

” নিজেদের নাম কেন বার্ড নেস্ট রেখেছে তারা সেটা জানা যায়নি । এদের উপস্থিতি প্রথম লক্ষ করা হয় গত বছরের জুন মাসের শেষ দিকে । চট্টগ্রামের সবথেকে বড় অবৈধ অস্ত্রের ডিলার হুসাইনের উপর আক্রমণ করে এরা । তাছাড়া হুসাইন সহ তার দলের বাইশজন কে মার্ডার করে বার্ড নেস্ট নামের সংগঠনের লোকরা । সপ্তাহখানেকের মধ্যে তাদের সংগঠন হুসাইনের অস্ত্রের বিজনেস পুরো দখল করে নেয় । সাথে সাথে অন্য ডিলারদের সাথে ডিল করে নেয় তারা । ছয় মাসের মধ্যে তাদের রাজত্ব প্রায় সবখানেই জুড়ে বসে । বেশিরভাগ অবৈধ অস্ত্র তারা সাপ্লাই দিতে শুরু করে সবাই কে । তাছাড়া তারা তাদের কাজে বেশ দক্ষ । এদের সংগঠনের প্রিয় অস্ত্রের তালিকাভুক্ত হচ্ছে গ্লক নাইনটিন , কোল্ট M16A4 রাইফেল । বর্তমানে বার্ড নেস্টের সুনাম এতটা হয়েছে, বলা হয় যে তাদের কাছে কেউ যদি ট্যাংক ও অর্ডার দেয় তাহলে সেটা ও তারা ডেলিভারী দিবে । পুরো সংগঠনের জড়িত কে কে রয়েছে এটা পুরোপুরি ক্লিয়ার না হলেও সরকারি উচ্চপদস্থ কেউ এদের সাথে জড়িত রয়েছে এটা সন্দেহ করা হয় । তাছাড়া ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ থেকে শুরু করে সবখানেই এদের লোক রয়েছে সন্দেহ করা হয় । বেশ কয়েকবার এদের ধরার জন্য স্পেশাল ফোর্স পাঠানো হয়েছিলো । প্রতিবার বিফলে গিয়েছে সব প্রচেষ্টা । কারণ এরা কোনভাবে আগে আগে সব জেনে গিয়েছিলো । শেষবার ভাগ্যক্রমে এদের দলের নাহিদ নামে একজন ধরা পরে বেশ অস্ত্রসহ । যদিও নাহিদ স্বিকার করেনি সে বার্ড নেস্ট এর সাথে যুক্ত কোনভাবে । তবে গোয়েন্দা বিভাগের কারো কোন সন্দেহ নেই সে কোনভাবে বার্ড নেস্ট এর সাথে যুক্ত । তাকে বর্তমানে সেন্ট্রাল জেলে এ রাখা হয়েছে । নাহিদের আগে একবার অন্য একজন কে কিছুক্ষণের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিলো । যদিও গ্রেফতার করার কিছুক্ষণ পর স্পেশাল ফোর্সের উপর আক্রমণ করে বার্ড নেস্ট এর লোকেরা । শেষে ধরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না দেখে তাকে বার্ড নেস্টের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয় । ওই লোকটার পরিচয় বের করা সম্ভব হয়নি । তবে তাকে দিয়ে দেওয়ার পর বার্ড নেস্ট স্পেশাল ফোর্সের কোন ক্ষতি করেনি । তাদের সেখানে বেঁধে রেখে তারা চলে যায় । এখন পর্যন্ত বার্ড নেস্টের লিডার আদি ছাড়া আর কারো পরিচয় বের করা সম্ভব হয়নি । বার্ড নেস্টের লিডারের পুরো নাম মাসুম আহমেদ আদি । চার বছর সামরিক বাহিনীতে কাজ করার পর তাকে স্পেশাল ফোর্স নেওয়া হয় তার কাজের পদ্ধতি ও বিচক্ষণতা দেখে । হাইলি ট্রেইন সোলজার আদি । হ্যান্ড টু হ্যান্ড ফাইট, রাইফেলে শুটিং, স্নাইপিং আর নাইফ থ্রোইং এ দক্ষতা রয়েছে তার । অস্ত্রের সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান আর অপারেশনের প্লানিং এ মাষ্টার মাইন্ড হিসাবে বিবেচিত করা হতো তার ইউনিটে । হঠাৎ করে তাকে চাকুরি থেকে ছাটাই করা হয় তার কিছু কর্মকান্ডের জন্য । স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির অভিযোগ তার উপর করা হয় । এবং সেটা প্রমানিত হওয়ার পর দুই বছরের জন্য জেলে পাঠানো হয় । পরবর্তী জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর এক বছর তার কোন সন্ধান পাওয়া যায় না । একবছর পরে তথ্য পাওয়া যায় সে বার্ড নেস্ট এর প্রধান । তার পরিবারের উপর কড়া লক্ষ রাখা হচ্ছে সবসময় । যদিও পরিবারের সাথে কোন যোগাযোগ নেই তার । ………….. ”

আরো কিছু কথা লেখা ছিলো ফাইলে । ফাইলটা পড়া শেষ করে মুখ তুলে তাকালো ঈশান । ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের প্রধান ফজলুল করিম একটার পর একটা সিগারেট টেনে যাচ্ছিলো । ঈশানের মুখ তুলে তাকানোর সাথে সাথে কথা বলতে শুরু করলো সে ।

– ঈশান আমি জানি তোমার মানসিক অবস্থা খুব খারাপ । তবে তোমার ভাই আর তার স্ত্রীর জন্য আমাদের কিছু করার নেই । এখন তাদের মৃত্যু অযথা যাতে না হয় সেটা আমাদের দেখা উচিত । তুমি এ কেসের জন্য যোগ্য এ কারনে তোমাকে দিচ্ছি না শুধু কেসটা । আমি চাই যাতে তুমি তোমার প্রতিশোধ নিতে পারো । তবে তার আগে আমার সিউর হওয়ার দরকার তুমি কতটা সুস্থ একাজ করার জন্য । আর বার্ড নেস্ট এর ব্যাপারটা সম্পূর্ণ গোপনীয় এটা মাথায় রাখতে হবে । এখন পর্যন্ত মিডিয়া এদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না সেটা ভেবে কর্মকান্ড ঠিক করতে হবে তোমার । তবে তোমার মেন্টাল অবস্থা নিয়ে আমি চিন্তিত ।

– কিভাবে নিশ্চিত করতে পারি আপনাকে ?

– তুমি রুমে প্রবেশ করা থেকে এ পর্যন্ত আমি কফিতে কাপ চিনি নিয়েছি ? আর কি কি করেছি আমি যা লক্ষ করার মত ?

– দুই কাপ ব্লাক কফি । প্রথম কাপে তিন চামচ চিনি, দ্বিতীয় কাপে দুই চামচ । চারটা বেনসন সিগারেট আর একটা সুইচ । তবে এক প্যাকেটে কেন দুধরনের সিগারেট রেখেছেন ক্লিয়ার না । প্যাকেটে এখনো বারোটা সিগারেট রয়েছে যার দুই টা সুইচ । আপনার ডান পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা কোন কারনে । কারণ কিছুক্ষণ পর পর আপনার মুখটা যন্ত্রণায় কুঁচকে যাচ্ছে আর হাতটা পায়ের দিকে চলে যাচ্ছে । হয়তো আজকে আপনার কোন ডক্টরের কাছে appointment আছে ।

কথাগুলো শুনে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ফজলুল করিম । এ রকম পরিস্থিতিতে ছেলেটার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা একটুও কমেনি । তার এ মূহুর্তে কোন সন্দেহ নেই যদি কেউ বার্ড নেস্ট এর প্রধান কে ধরতে পারে তাহলে এ ছেলেই পারবে । আর এ ছেলে সেটা করেই ছাড়বে । কারন ব্যপারটা এখন শুধু অফিসিয়াল না ঈশানের কাছে । পার্সোনাল ও বটে । হালকা টুকটাক কথা বলে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো ঈশান । তার চোখ জ্বলজ্বল করছে এ মূহুর্তে । এ কাজটার জন্য সে বহুদিন অপেক্ষা করেছিলো একসময় । মাসখানেক আগেও তার ইচ্ছে ছিলো বার্ড নেস্টের পিছনে লাগার । তবে এরা কখনো তাকে এ কেসে নিযুক্ত করেনি । কারণ বেশ অনেকজন এই কেস এ নিযুক্ত ছিলো । তবে আজ এ কেসে নিযুক্ত হয়েছে এটা ভেবে কোন অনুভূতি তার মধ্যে আসছে না । এভাবে সে চায়নি কখনো কেসটাতে তাকে নিযুক্ত করা হোক । তবে এখন ছেড়ে দেওয়ার কোন মানে নেই । শেষ দেখতে হবে এর । এর জন্য যত কিছু বিসর্জন দিতে হয় সে দিবে । তবে এখন হয়তো ঈশানের কাছে নিজের জীবন ছাড়া বিসর্জন দেওয়ার কিছু নেই ।

 

রুমে চারজন লোক উপস্থিত এ মূহুর্তে । বার্ড নেস্টদের ধরার জন্য স্পেশাল ডিটেকটিভ টিম এরা । দুইটা বড় বড় টেবিল যার একটিতে কম্পিউটারে একমনে রুহায়েত রহমান কাজ করছে । ঈশান আর হাবীর অন্য টেবিলে উপরে কয়েকটা কাগজ রেখে কথা বলছে একে অন্যের সাথে । রুমের চতুর্থ ব্যক্তি জাহাঙ্গীর চুপচাপ বসে রয়েছে । যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সে কোন কাজ করছে না । তবে তার কাজ ভিন্ন । ঈশান জাহাঙ্গীরের দিকে তাকিয়ে বললো,

– ইকবালের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে ?

– গিয়েছে । তবে তেমন কিছু জানা যায়নি । সাধারন লেভেলের ভাড়াটে খুনি । তাকে অল্প সময়ের জন্য হয়তো ভাড়া করা হয়েছিলো । ইকবালের পরিবার বলতে কিছু নেই । আশ্রমে বড় হয়েছে সে । টাকার বিনিময়ে খুন করে সে । তার কল লিষ্ট চেক করেও কোন ফলাফল পাওয়া যায়নি ।

– হু যা ভেবেছিলাম আমি । যাই হোক বর্তমানের প্লানের উপর কোন মতামত রয়েছে তোমার ?

– এটা না করাই ভালো । ফজলুল স্যার কি বলেছিলো নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে । আদি আমাদের ছাড়বে না যদি আমরা তার পরিবারের লোকদের নিয়ে কিছু করি । পরিবারসহ শেষ করে দিবে আমাদের । এটা করা মানে নিজেদের কবরে পাঠানো আর কি । তাছাড়া…

– তাছাড়া কি ?

– তার পরিবার কে প্রশ্ন করেও কোন লাভ নেই । আগেও বেশ কয়েকবার করা হয়েছে । কোন সুফল আসেনি । তারা বাস্তবিকই কিছু জানে না । মাঝখানে দিয়ে যারা এসব করেছে তারা অনেক ঝামেলায় পরেছিলো । তাদের মধ্যে চারজন কে কিডন্যাপ করে আচ্ছা মত টর্চার করেছিলো আদি । ভবিষ্যতে কেউ যদি তাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করে তাহলে হয়তো উপরে পাঠানোর টিকিট কেটে দিবে ।

– আমি জানি তারা কিছুই জানে না । তবে আমি এ কারনে কিছু করছি না । আমি চাই অন্য কিছু চাচ্ছি । সেটা অবশ্য তোমার না জানলেও চলবে ।

– স্রেফ পাগলামীর নামান্তর এটা । কোন ভালো সুফল আসবে না । তাছাড়া আমার ধারনা তারা অলরেডী জানে আপনি এই কেসের চার্জে রয়েছেন । ঈশান ভাই আমাদের পরিবার রয়েছে এটা মাথায় রাখবেন ।

– তুমি যদি টিমে না থাকতে চাও তবে আমি বাধ্য করবো না ।

– আমি বিপদের কথা জেনেই এসেছি এ কাজে । আপনি যেটা বলবেন সেটা করতে আমি বাধ্য । আমি না সবাই বাধ্য । কারন আপনি লিডার আমাদের । আমি শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি ।

– তো কি করতে হবে আমার ?

– প্লান পরিবর্তন করেন । আইনের বাহিরে গিয়ে কাজ করতে হবে । কথাটি বলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জাহাঙ্গীর ।

 

তিন.

জাহাঙ্গীর একটা নামকরা স্কুলের সামনে বসে রয়েছে । তবে ঠিক স্বাভাবিক বেশে না । ভিক্ষুক সেজে বসে রয়েছে স্কুলটার সামনে । তার এ মূহুুর্তে কাজ হচ্ছে চারপাশটা লক্ষ রাখা কিছুদিন । স্কুলটিতে আদির দুই মেয়ে পড়াশোনা করে । তো আদি সাহেব যদি এখানে আসে তাহলে ধরা সম্ভব হলেও হতে পারে । টুং করে প্লেটে একটা কয়েন এসে পরলো । এক টাকার কয়েন । জাহাঙ্গীরের মেজাজ চরমভাবে খিচরে গেল । এই যুগে একটাকা দিয়ে কি হয় ? একটাকা কি ভিক্ষার মধ্যে পরে ? শালার পাবলিক ! কালো রংঙের একটা প্রাইভেট কার স্কুল থেকে একটু দূরে দাড়িয়ে রয়েছে । জাহাঙ্গীরের কেন যেন মনে হচ্ছে ওই গাড়ি থেকে তাকে লক্ষ করা হচ্ছে । স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে আধা ঘন্টা হয়েছে । প্রায় সব ছাত্র ছাত্রী চলে গিয়েছে । জাহাঙ্গীর অনুভব করছে এখন তার ওঠার দরকার । এখানে আপাতত সময় নষ্ট করার কোন দরকার নেই । সবকিছু গুছিয়ে উঠতে যাবে এমন সময় কালো রংয়ের প্রাইভেট কারটা এগিয়ে আসতে শুরু করলো । এসে ঠিক জাহাঙ্গীর এর পাশে এসে দাড়ালো । জাহাঙ্গীর তাকিয়ে দেখলো গাড়ির ভিতরে । দুইজন লোক রয়েছে ড্রাইভারসহ । তবে ড্রাইভিং সিটে বসা লোকটাকে দেখে জাহাঙ্গীরের সুবিধার মনে হচ্ছে না । ফর্সামত সবুজ চোখের আঠাশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সী যুবক । একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে । জাহাঙ্গীর হাতের ভিক্ষার প্লেট এগিয়ে দিলো । সবুজ চোখের ছেলেটা কোন কথা না বলে পাঁচশো টাকার একটা নোট তার প্লেটে দিলো । জাহাঙ্গীর অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে । এত টাকা ভিক্ষা কেন দিচ্ছে ছেলেটা ? মতলব কি ? আচ্ছা তার এখন কি করা উচিত ? এতটাকা যখন ভিক্ষা দিয়েছে তাহলে কি একটু দোয়া করা দরকার না ? ভিক্ষার প্লেট থেকে চোখ সরিয়ে সবুজ চোখের ছেলেটির দিকে তাকাতেই জমে গেল জাহাঙ্গীর । আমেরিকান তৈরী পলিমার ফ্রেমের গ্লক নাইনটিন তার দিকে তাক করা রয়েছে । আর অস্ত্রটা সেই সবুজ চোখা ছেলেটির হাতে । গ্লক নাইনটিন এ চেম্বারের লোডেড বুলেট সহ ১৬ রাউন্ড 9×19mm ক্যালিবারের বুলেট ধরে । ৭.৩৬ ইঞ্চি লম্বা, ১.১৮ ইঞ্চি চওড়া আর ৪.৯৯ ইঞ্চি উচ্চতার ২৩.৬৫ আউন্সের বেশ ভালো মানের অস্ত্র গ্লক নাইনটিন । গাড়ি থেকে অন্য লোকটা এক ফাঁকে বেরিয়ে এসেছে । তার হাতেও একটা গ্লক নাইনটিন দেখা যাচ্ছে । সে এসে ঠিক জাহাঙ্গীরের পিছনে এসে দাড়ালো । কিছু বুঝে উঠতে পারার আগে জাহাঙ্গীর গ্লক এর বাটের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পরলো ।

 

চোখ খুলে জাহাঙ্গীর মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রণা অনুভব করলো । মাথায় হাত দিয়ে অনুভব করলো ফুলে টসটস করছে সেখানে । সোজা হয়ে তাকিয়ে রুমে কাউকে দেখলো না জাহাঙ্গীর । ৬০ ওয়াটের একটা লাইট সিলিং এ ঝুলছে । সমস্ত রুমে আসবাবপত্র বলতে কিছুই নেই । শুধু সিলিং এর কোনায় একটা সিসি ক্যামেরা দেখা যাচ্ছে । ক্যামেরাটা দিকে তাকিয়ে জাহাঙ্গীর অপেক্ষা করছে । এর নিশ্চয়ই শুধু বন্দী করে রাখতে এখানে ধরে নিয়ে আসেনি । খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলোনা । দশ মিনিটের মাথায় দুইজন লোক রুমে প্রবেশ করলো । তারা দুইজন হাতের উদ্যত অস্ত্র দিয়ে ইশারা করে রুম থেকে বের হতে বললো । জাহাঙ্গীর কথা না বাড়িয়ে হাটতে শুরু করলো । পিছনে লোক দুইজন হেটে আসছে জাহাঙ্গীরের দিকে অস্ত্র তাক করে । এই রুমটা বেশ বড়সর । রুমের আসবাবপত্র বলতে বড় একটা স্টিলের টেবিল আর টেবিলের দুপ্রান্তে দুইটা স্টিলের চেয়ার । কোন কিছু বলতে হলো না জাহাঙ্গীরকে । কথা না বাড়িয়ে সবথেকে কাছের চেয়ারে বসে পরলো সে । জাহাঙ্গীর বসার কয়েক মিনিট পরে ৩৫ বছর বয়সী একজন মানুষ রুমে প্রবেশ করলো । তার সাথে আরো একজন রুমে প্রবেশ করেছে । সেই গাড়িতে দেখা সবুজ চোখের লোকটা । সবুজ চোখা ছেলেটা কে এটা না জানলেও অন্য লোকটার পরিচয় জাহাঙ্গীর ভালোভাবেই জানে । বার্ড নেস্ট এর লিডার মাসুম আহমেদ আদি । আদি এসে অন্য চেয়ারে এসে বসলো ।

– হ্যালো জাহাঙ্গীর সাহেব । কেমন আছেন ?

– ভালো ।

– আমার পরিবারের উপর বেশ কয়েকদিন ধরে নজর রাখছেন আপনি । বাসার উপর তো চব্বিশ ঘন্টা নরজদারি করেন । হঠাৎ স্কুলের উপর ও যে শুরু করলেন । কারনটা কি ?

– যে কারনে আপনার বাসায় নজর রাখা হয় ঠিক সে কারনেই ।

– উহুঁ । একথা আমাকে বলে লাভ নেই । আপানাদের এই কাজগুলো সম্পর্কে অফিস কিছু জানে না । আপনারা ভালো কিছু করতে যাচ্ছেন না এটা বোঝা যায় । তো প্লান কি আপনাদের ?

– আমি কেন বলতে যাবো প্লান কি ? আপনি নির্বোধের মত কথা বলছেন ।

– হয়তোবা । তবে সত্য হচ্ছে আমি আমার পরিবারের ক্ষেত্রে খুব সচেতন । কেউ আমার পরিবারের উপর লক্ষ রাখুক তাতে আমার সমস্যা নেই । তবে কোন ক্ষতি করার প্লানিং থাকলে সেটা আমি সহ্য করবো না ।

– আমি কেন ক্ষতি করার জন্যই সেখানে নজর রাখছি আপনার ধারনা হলো ?

– আপনাদের হেড কোয়ার্টার পরিবর্তন করা উচিত । সব তথ্যই বাহিরে ফাঁস হচ্ছে । যাই হোক কিছু জিনিস অবশ্য ক্লিয়ার না । যেমন যদি আমার স্ত্রী আর দুই মেয়েকে কিডন্যাপ করে কি করতে চাচ্ছেন ? তারা তো কিছু জানে না এমন যে যেটা আপনাদের সহায়তা করবে । তাছাড়া তাদের কিডন্যাপ করলেও শুধু ঝামেলাই বাড়বে আপনাদের । একে তো আইনের বাহিরে কাজটা করবেন । দ্বিতীয় আমি তো আছিই । আইনের লোক হয়ে আইনের বাহিরে কাজ করার ইচ্ছে ভালো না বুঝলেন । যাই হোক কি করবেন তাদের কিডন্যাপ করে ?

– ঈশান ভাই জানে । সে কখনো সব বিষয় ক্লিয়ার করে না । তবে আপনাকে সামনাসামনি দেখা করানোর জন্য হয়তো একাজ করছে ।

– প্রথমে আমারও তাই মনে হচ্ছিলো । কিন্তু শুধু একাজের জন্য এত কাহিনী মানাচ্ছে না ঠিক । যাই হোক আপনি কোন কাজে আসছেন না আর আমাদের । তাছাড়া আপনি তেমন কিছু জানেন না এটা আমি জানি । যাই হোক Good bye । কথাটা শেষ করার আগে জাহাঙ্গীর দাড়িয়ে তার পিছনে দাড়ানো লোকটার উপর আক্রমণ চালালো । প্রথমে লোকটার সোলার প্লেক্সাস বরাবর একটা ঘুসি চালিয়ে দিলো । ঘুসির আঘাতে লোকটা ফ্লোরে হাটু ভেঙে বসার সাথে সাথে তার উপর একটা কিক ঝেড়ে দিলো জাহাঙ্গীর । কিক দেওয়ার কারনে ছিটকে ফ্লোরে পরলো লোকটা । সাথে সাথেই জাহাঙ্গীর লোকটার বেল্টে গুঁজে রাখা গ্লক নাইনটিন হাত তুলে নিয়ে অাদির দিকে তাক করলো । পুরো ঘটনার সময় ছিলো তিন সেকেন্ড । বা তার কম । ঘটনার আকস্মিকতার আদি আর তার সাথের সবুজ চোখের ছেলেটা একটু অবাক হয়নি । তারা যেন এরকম আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলো আগে থেকেই । আদি শুধু বললো , রায়হান নিউট্রিলাইজ হিম । এখানে সময় নষ্ট করার কোন ইচ্ছে নেই আমার । কথাটা বলার সাথে সাথে সবুজ চোখের ছেলেটা অর্থাৎ রায়হান এগিয়ে আসতে শুরু করলো । জাহাঙ্গীর জানে কোন উপায় নেই তাই বাধ্য হয়ে রায়হানের কাধ লক্ষ করে গুলি করলো । গ্লকের মধ্যে থেকে ক্লিক একটা শব্দে জানান দিয়ে দিলো যে চেম্বার খালি । চেম্বারে বুলেটের জন্য লোড করতে গিয়ে জাহাঙ্গীর অনুভব করলো গ্লকটাতে কোন বুলেট লোড করা হয়নি । তাহলে এত সময় লোকটা কেন গ্লক নিয়ে তার পাশে দাড়িয়ে ছিলো ? জাহাঙ্গীর আক্রমণ করবে এ কথা তাদের মাথায় ছিলো মেনে নেওয়া যায় কিন্তু তাহলে তাকে বেধে রাখলেই পারতো । কি দরকার ছিলো এসবের ? আদি আসলে কি দেখতে চেয়েছিলো ? তার ট্রেনিং লেভেল ? ভাবছে জাহাঙ্গীর । রায়হান কাছে আসতেই জাহাঙ্গীর ঘুসি চালিয়ে দিলো কিন্তু দ্রুততার সাথে রায়হান সেটি এড়িয়ে জাহাঙ্গীরের পায়ের উপর কিক ঝেড়ে দিলো । জাহাঙ্গীর ভারসাম্য হারিয়ে পরে যাচ্ছে এমন সময় দ্বিতীয় হিট করলো রায়হান । জাহাঙ্গীরের মাথাটা ধরে গায়ের শক্তিতে টেবিলের সাথে টুকে দিলো । সাথে সাথে বসে পরলো জাহাঙ্গীর ফ্লোরে । দ্রুত সোজা হয়ে মাথা ঝাড়ি দিয়ে ঝিমঝিম ভাবটা কাটানোর চেষ্টা করছে জাহাঙ্গীর । কিন্তু কোন লাভ হলোনা । মাথা ফেটে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছে । রায়হান তার হাঁটু দিয়ে গায়ের জোড়ে তৃতীয়বারের মত আঘাত করলো জাহাঙ্গীরের মাথা লক্ষ করে । এ আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা নেই জাহাঙ্গীরের । অচেতন হয়ে লুটিয়ে পরলো সে ।

 

চার.

ঈশানের টেনশনের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে । বারবার তার কাছে মনে হচ্ছে রিস্কটা বেশি হয়ে গিয়েছে । আদি যদি জাহাঙ্গীরকে মেরে ফেলে তাহলে ? মাথা ঝাড়ি দিয়ে চিন্তাটা দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো ঈশান । আপাতত তারা তিনজন একটা ট্রাকিং ভ্যানে বসে রয়েছে । টেনশনের সাথে ঈশানের মনে কিছুটা আনন্দ রয়েছে এ মূহুর্তে । তার টোপ আদি গিলেছে । আদি কিভাবে ভাবলো যে তাদের অফিসে ট্রান্সমিটার প্লান্ট করবে আর তারা বুঝতে পারবে না ? তো সবকিছু হিসাব করে ঈশান সিদ্ধান্ত নেয় টোপ ফেলবে মাসুম আহমেদ আদিকে ধরার জন্য । প্রথম তারা একটা ফেইক প্লান করলো ঠিক বার্ড নেস্টের রেখে যাওয়া ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটারের মাইক্রোফোনের সামনে । আদির পরিবারের উপর আক্রমণ করার প্লান । স্বভাবতই আদি এখানে হস্তক্ষেপ করবে এটা ঈশান জানতো । জাহাঙ্গীরের উপর এখন সব নির্ভর করছে । কিছুক্ষন আগে জাহাঙ্গীর কে আদির লোকেরা তুলে নিয়ে গিয়েছে । জাহাঙ্গীর এর শরীরে চারটা ট্রাকিং ডিভাইস রয়েছে । সেগুলো থেকে প্রতিমূহুর্তে সিগনাল দিচ্ছে তার অবস্থান সম্পর্কে । নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ঈশান ফলো করে যাচ্ছে জাহাঙ্গীর কে । হঠাৎ থেমে যেতে দেখলো জাহাঙ্গীর এর চলাচল । পৌছে গিয়েছি নাকি ? ভাবছে ঈশান । সাথে সাথে নিজের সাথে দ্বিমত পোষন করলো ঈশান । কারণ জাহাঙ্গীর এখন রয়েছে একটা পার্কিং লটে । অসংখ্য গাড়ির মধ্যে যদিও জাহাঙ্গীর কে কিডন্যাপ করা গাড়িটি দেখা যাচ্ছে না তবে সিগন্যাল জানান দিচ্ছে না এখানেই রয়েছে জাহাঙ্গীর । ২০ মিনিট অপেক্ষা করলো ঈশান । কোন মুভমেন্ট দেখা যাচ্ছে না । নিজেদের বেশভূষা পরিবর্তন করে ঈশান বেরিয়ে পরলো সাথে হাবীবকে নিয়ে । সোজা হাটতে শুরু করলো জাহাঙ্গীরের লোকেশনে । তার মনে একটা কু-ডাক দিচ্ছে । কেন যেন মনে হচ্ছে তারা কিছু একটা মিস করছে । জাহাঙ্গীর এর লোকেশনে এসে আশাহত হতে হলো ঈশান কে । পুরো প্লান ভেস্তে গিয়েছে । জাহাঙ্গীর এর সাথে লাগানো ট্রাকিং ডিভাইসগুলো ফেলে রাখা হয়েছে এখানে । দ্রুত এদিকে ওদিকে তাকিয়ে খুঁজে বের করলো ঈশান জাহাঙ্গীর কে কিডন্যাপ করা গাড়িটা । কাছে যেতে এবারো আশাহত হতে হলো ঈশান কে । খালি গাড়ি ফেলে রেখে গিয়েছে সন্ত্রাসীরা । জাহাঙ্গীরকে তারা খুন করবে না এটা ভালোভাবেই জানে ঈশান । এজেন্ট খুন করলো পুরো ফোর্স তাদের পিছনে লাগবে এটা বোঝার ক্ষমতা লিডার আদির রয়েছে এটা জানে ঈশান । তবে আদিকে ধরার প্লান পুরো বাতিল হয়ে গিয়েছে । তবে এখনো একটা ছোট সুযোগ রয়েছে । একটা ট্রাকিং ডিভাইস তাদের সবার মুখে দাঁতে লাগানো রয়েছে । কোন বিপদে পরলে সেটা অন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলো ঈশান । জাহাঙ্গীর এখন নিশ্চিত চেতনাহীন অবস্থায় রয়েছে তবে যদি জ্ঞান ফিরে আসে তাহলে সে ওটা থেকে সিগন্যাল দিবে । তখন হয়তো একটা সুযোগ পাওয়া যাবে ।

 

দুই ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছে ঈশান । কখন জাহাঙ্গীর সিগন্যাল পাঠাবে । কিন্তু ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছে কোন সিগন্যাল আসবে না । কিছুক্ষন ভেবেচিন্তে ঈশান কল করলো তার চাচা শওকত হাসান কে । ঈশান সাধারণত কোন সমস্যার মাঝে পরে তখন তার চাচার কাছে থেকে বুদ্ধি নেয় । আপাতত বলা যায় ঈশান বেশ বড় সমস্যার মাঝে পরেছে । কয়েকবার কল দেওয়ার পরও তার চাচা কল রিসিভ করলো না । ঈশান সিদ্ধান্ত নিলো আজকে রাতে একবার যেতে হবে তার চাচার বাসায় । কথা বলার অনেককিছু বাকি রয়েছে । অপেক্ষা করতে করতে যখন ঈশান ক্লান্ত ঠিক তখনই একটা সিগন্যাল দেখাতে শুরু করলো মনিটরে । সিগন্যাল দেখে মনে হচ্ছে এটা বেশ দূরে । ঈশান দ্রুত ট্রাক করতে বললো রুহায়েত কে । যা ভেবেছিলো ঈশান । ঢাকার বাহিরে থেকে সিগন্যাল আসছে । যত দ্রুতই তারা চেষ্টা করুক না কেন দেড় ঘন্টার আগে কোনভাবেই সম্ভব না সেখানে উপস্থিত হওয়া । উপায় না দেখে ফোর্স পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলো ঈশান । কয়েকটা কল সেরে ঈশান রওয়ানা দিলো জাহাঙ্গীরের উদ্যেশ্য । ফোর্স যদি খুব দ্রুতও যায় তাহলেও অন্তত আধা ঘন্টা লাগবে তাদের ওইখানে যেতে । ঈশান এক মনে রাস্তায় কালো পিচের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে । তার ধ্যান ভেঙে গেল মোবাইলের রিংটোনের শব্দে । হাত মোবাইলটির কল রিসিভ করতে গিয়ে হৃদপিণ্ড কয়েকটা বিট মিস করলো ঈশানের । প্রাইভেট নম্বর । কল রিসিভ করে কানে চেপে ধরলো ঈশান ।

– হ্যালো,  ঈশান সাহেব ?

– কে বলছেন ?

– আপনি তো জানেন কে কথা বলছে । শুধু শুধু কথা বাড়াচ্ছেন কেন ? যাই হোক কাজের কথায় বলি । আপনার এজেন্ট জাহাঙ্গীর যে আমার আন্ডারে রয়েছে এটা তো জানেন । তার অবস্থান আপনাকে মেসেজ করে দিয়েছি । তাকে মুক্ত করে নিয়ে যান । আর হ্যাঁ একটু দ্রুত করবেন কারন সে বেশ ভালোভাবেই আহত । যদিও হালকা ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়েছে তবে যথেষ্ট না ।

– আপনি বুদ্ধিমান । আশাকরি বুঝতে পারছেন জাহাঙ্গীরের কিছু হলে আপনাকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চে সব লোক লেগে থাকবে ।

– আচ্ছা তাই নাকি ? যাইহোক তার কোন সিরিয়াস ক্ষতি আমরা করিনি । তবে ঈশান সাহেব নেক্সট বার যদি আমার পরিবারের উপর আক্রমণের প্লান করেন তখন আপনারা কি করতে পারেন এটা আমি কেয়ার করবো না । এবারের মত ছাড়বো না । কি বলছি আশাকরি বুঝতে পেরেছেন ।

– হুম । সংক্ষিপ্ত উত্তরে বললো ঈশান ।

– বুঝতে পারলেই নিজেদের জন্য ভালো । যাইহোক ভালো থাকবেন ।

কল কেটে দিয়েছে আদি । তারপরও ঈশান মোবাইল কানে চেপে ধরে রেখেছে । তার দৃষ্টি এ মূহুর্তে ট্রাকিং মনিটরে দিকে । জাহাঙ্গীরের পাঠানো সিগন্যালের মুভমেন্ট দেখা যাচ্ছে । কিছুক্ষণের আগের অবস্থানের ঠিকানার সাথে তার মোবাইলে আগত মেসেজের সাথে মিলিয়ে দেখলো । উহু কিছু একটা ঠিকমতো চলছে না । জাহাঙ্গীর প্রথমে যেখান থেকে সিগন্যাল পাঠিয়েছিলো সেটাই তাকে মেসেজ করে পাঠানো হয়েছে । তবে সিগন্যালের কেন মুভমেন্ট দেখা যাচ্ছে ? কয়েক সেকেন্ড ভাবার সাথে সাথে ঈশান  বুঝতে পারলো কি হচ্ছে । হালকা হাসি তার ঠোঁটে ফুলে উঠেছে ।

 

পাঁচ.

বেশ কিছুক্ষণ ধরে অয়ন দাড়িয়ে আছে গলির মুখে । পাশে একটা পান সিগারেটের দোকান , সেখানে সে বারবার তাকাচ্ছে । তার খুব ইচ্ছে করছে এখন সোজা একটা সিগারেট ধরিয়ে ফুসফুস ভরা ধোঁয়া নিতে । কিন্তু সে নিজেকে অনেক কষ্টে দমিয়ে রাখছে এ কাজ থেকে । দুই মাস হয়েছে সে সিগারেট ছেড়ে দিয়েছে । আগে তার দিনে কমপক্ষে দেড়- দুই প্যাকেট সিগারেট লাগতো । সেখানে থেকে একবারে ছেড়ে দিয়েছে । আগে অনেক চেষ্টা করেছে ছাড়তে তারপরও পারেনি কখনো । তারপর তিশার সাথে বিয়ে হওয়ার পর কিছুদিন সিগারেট টানতো আর তিশার অনুরোধ বা শাসন যেটাই বলা হোক না কেন ছেড়ে দিয়েছে সিগারেট অয়ন । অয়ন বাসায় ঢুকে লিফটের সামনে দাড়ালো । অল্প সময়ের মধ্যেই লিফট নিচে নেমে আসলো, লিফটে চড়ে সে আট নম্বর ফ্লোরের বাটন এ চাপ দিতে যাবে এইসময় দরজায় আরেকজন লোক এসে দাড়ালে । এই হালকা শীতের মধ্যেও সে ভারী জামাকাপড় পড়েছে । চোঁখে চশমা আর মাথায় ক্যাপ । চেহারা যাতে না বোঝা যায় তার সর্বোচ্চ চেষ্টা যেন লোকটি করেছে ।

 

লোকটি লিফটে উঠে কোন বাটন এ না চাপ দিয়েই একপাশে দাড়িয়ে রইলো । অয়ন কিছুটা বিরক্ত বোধ করছে লোকটার গেটআপ দেখে । ভাবছে মাথায় সমস্যা রয়েছে নাকি লোকটার ? সাথে সাথে অন্য কিছু চিন্তাও মাথায় আসলো তার । তবে সেই চিন্তাটা থেকে দূরে সরিয়ে দিলো সে । অনেক আগেই সে ওইসব কাজ ছেড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের মত জীবনযাপন করছে । এখন এসব নিয়ে ভাবার কোন কারন দেখছে না । একথা ভাবতে ভাবতে সে অষ্টম ফ্লোরে চলে আসলো । একবার অদ্ভুত ড্রেস আপ নেওয়া লোকটার দিকে তাকিয়ে লিফট দিয়ে বের হয়ে আসলো অয়ন । মনের কোন একটা অংশ তাকে বারবার সর্তক হতে বলছে লোকটার ব্যাপারে । এক ঠায় দাড়িয়ে রয়েছে লোকটা যেমন ছিলো লিফটের ওঠার সময় । নিজের ফ্লাটে রওয়ানা দেওয়ার সময় হঠাৎ সে অনুভব করলো কিছু একটা তার ডান কাধে যন্ত্রণা দিচ্ছে,খুব পরিচিত এক যন্ত্রণা । কাধ থেকে শরীরের বাম পাশে যন্ত্রণাটা ছড়িয়ে গিয়েছে তার । তাকালো সে নিজের কাধের দিকে । তার সাদা শার্ট টা হঠাৎ করেই যেন লাল বর্ণ ধারন করছে । আর সে রংটা যেন প্রতি মূহুর্তে ছড়িয়ে পরছে । অনেক বছরের পুরোনো ট্রেনিং হঠাৎ করে যেন তার মধ্যে ফিরে আসলো । লাফ দিয়ে সে এক পাশে সরে গিয়ে একটা ফ্লাটের দরজার পাশে আড়াল নিলো । মৃদু আরো দুইটা শব্দ শুনতে পেয়ে নিজের দিকে তাকালো । না আর কোথাও রক্তপাত হচ্ছে না অর্থাৎ গুলি লাগেনি আর । অয়নের শরীরের প্রতিটি কোষ যেন সজাগ হয়ে গিয়েছে । হার্ট বিট গুলো আগের থেকে আরো দ্রুততর হচ্ছে ।

 

পকেট হাতরে সে তিন ইঞ্চি ফলা বিশিষ্ট একটি সুইচ নাইফ বের করে আনলো অয়ন । ডানহাতের নিয়ে সে মানসিকভাবে রেডি হচ্ছে পরবর্তী আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য । হালকা একটু মাথাটা বের করে আক্রমণকারীর দিকে তাকালো । হাতে একটা গ্লক 19 নিয়ে তার দিকে তাক করে রয়েছে । অয়ন তারাতারি মাথাটা সরিয়ে নিলো । গ্লক 19 এই রেঞ্জে ভয়ঙ্কর অস্ত্র, তার উপর রয়েছে বিশাল এমাউন্টের বুলেট সংখ্যা । অতঃএব আক্রমণকারীর বুলেট লোড করার সময় সে আক্রমণ করার সুযোগ পাচ্ছে না । দ্রুতগতিতে চিন্তা করছে অয়নের ব্রেইন । সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো সে, রিস্ক নেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই এখন । একবারেই সুযোগ পাবে আর সেখানে ফেল করলে সে মৃত । অয়ন নাইফ থ্রোইং এ তাদের টিমে বেশ ভালো ছিলো তাই সে মনে মনে একটা আশা দেখছে সফল হবার । যদিনা তার আগেই সে গুলি খায় । অয়ন পাশের দরজার দিকে তাকালো, হাত দিকে চেক করলো দরজা লক কিনা । হু লক করা তবে তালাটা খুব একটা শক্তিশালী নয় সুইচ নাইফের উল্টো দিক থেকে একটা পিন বের করে আনলো । দুইবার চেষ্টার পর সে দরজা খুলে ফ্লাটের ভিতরে প্রবেশ করলো । এখন তার মাথা বেশ ভালো কাজ করছে । এখন বেশ সুযোগ রয়েছে তার সফল হবার ।

 

ভারী ড্রেস পরা লোকটার নাম আমজাদ, পেশায় কন্ট্রাক্ট কিলার । সামনে এগিয়ে এসে অয়ন না পেয়ে দরজার দিকে তার গ্লক 19 তাক করলো । খুব সর্তকতার সাথে সে দরজা দিয়ে ভিতরে আসলো । কোথাও দেখা যাচ্ছে না অয়ন কে । আবার একটা দরজা খোলা দেখা যাচ্ছে । মুচকি হাসি ফুটে উঠলো আমজাদের মুখে । অস্ত্র টা তাক করে সে রান্নাঘর পার করে ওই দরজার দিয়ে প্রবেশ করলো । এটা বারান্দার দরজা বোঝার সাথে সাথে হাসি মুছে গিয়েছে আমজাদের মুখ থেকে । বুঝতে পারছে সে ফাঁদে পা দিয়েছে । মাথা ঘুরাতে গিয়ে আমজাদ লক্ষ করলো অয়ন হাতে একটা সুইচ নাইফ নিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে । অস্ত্রের নলটি সে ঘুরানোর চেষ্টা করলো নিজেকে বাঁচাতে । কিন্তু তার আগেই অয়ন তার কন্ঠনালী লক্ষ করে সুইচ নাইফটা থ্রো করলো । অয়ন ক্ষিপ্রগতি এগিয়ে আসলো, একটা কিক করে লোকটার হাতের অস্ত্রটা সরিয়ে নিয়ে আসলো । তার চেহারাতে রাগ কোন ভাবান্তর দেখা যাচ্ছে না । অতীতে সে বহু মানুষ খুন করছে নিজের হাতে, এসব দৃশ্য তার কাছে পুরাতন হয়ে গিয়েছে । আমজাদের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর তার গ্লকটা হাতে নিয়ে একবার চেক করে নিলো । এখনো এগারো রাউন্ড অবশিষ্ট রয়েছে সেখানে । সুইচ নাইফটা তুলে নিয়ে নিজের ফ্লাটের উদ্যেশ্য হাটতে শুরু করলো অয়ন । তার তিশার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে । মেয়েটা একা বাসায়, আল্লাহ কে স্বরন করতে করতে সে বাসায় প্রবেশ করলো সে । তবে অন্যদিনের মত স্বাভাবিক ভাবে না । দরজার তালাটা সে তার কাছের চাবি দিয়ে খুলে গ্লক হাতে নিয়ে প্রবেশ করলো । বাসায় কোন সাড়াশব্দ নেই, বেড রুমের দিকে যাচ্ছে আর প্রতিটি রুম পরীক্ষা করছে । কোথায় তিশাকে দেখতে পাচ্ছে না । ফ্লোরে রক্তের রেখা দেখা যাচ্ছে, রক্তের রেখা গুলোকে তার দৃষ্টি অনুসরণ করে খাটের পাশে চলে আসলো । তিশা লুটিয়ে পরে আছে সেখানে, বুকের মধ্যে হঠাৎ প্রচন্ড চাপ অনুভব করলো অয়ন । অনুভব করতে পারছে তার দুটি পা কাপছে । চলে আসলো সে তিশার কাছে, পালস চেক করে বুঝলো তার এখন আর কিছুই করার নেই । কারোই আর কিছু করার ক্ষমতা নেই ।

 

কিছুক্ষন তিশার পাশে বসে সোজা হয়ে দাড়ালো অয়ন, এখন এখান থেকে চলে যেতে হবে তার । এখানে আরো লোক আসবে তাকে খুন করার জন্য । দ্রুত সরে পরতে হবে তার । অয়ন আলমারির দরজা খুলে গোপণ কম্পার্টমেন্ট খুললো একটা ফাইল, একটা হ্যান্ডগান স্পিংফিল্ড এক্সডিএস মডেলের বের করে আনলো । সাথে দুইটা ম্যাগজিনের একটা লোড করে নিলো । স্পিংফিল্ড এক্সডিএস এর বুলেট ধারন ক্ষমতা সাত, লোড করা সহ টোটাল আটটি । সেখানে আরেকটা জিনিস দেখা যাচ্ছে সাধারণ একটা মোবাইল । যদিও এটা সেরকম কিছু না । এটা স্যাটেলাইটের সাথে সরাসরি কানেকশন দেওয়া রয়েছে । সবগুলো খাটের উপর রেখে সে দরজা লকটা চেক করে আসলো । হাতের ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো মাত্র নয় মিনিট ত্রিশ সেকেন্ড পার হয়েছে তার উপর আক্রমণের সময় থেকে । এবার অয়ন তার কাধেঁর ক্ষতটার দিকে একবার নজর দিলো । দ্রুত নিজের চিকিৎসা করতে লেগে পড়লো । কাধেঁর মাংস ছিঁড়ে চলে গিয়েছে বুলেট । মারাত্নক কোন কিছু না হলেও বেশ রক্ত ক্ষরণ হয়েছে সেখানে । তারাতারি ব্যান্ডেজ করে নতুন একটা সার্ট পরলো সে । গ্লক , এক্সট্রা ম্যাগজিন আর স্যাটেলাইট ফোনটা কোটের পকেটে রেখে স্পিংফিল্ড টা বেল্টের মধ্যে গুঁজে দিলো সে ।  সব কিছু জায়গা মত রেখে দিয়ে তার এখানে আসার সমস্ত প্রমাণ নষ্ট করলো । তার মন চাচ্ছে না তিশার লাশ এভাবে ফেলে রেখে যেতে । কিন্তু এই মূহুর্তে তিশার জন্য সময় যদি সে দেয় তাহলে বিশাল সমস্যায় পরবে সে এটা বেশ ভালোভাবেই সে বুঝতে পারছে । তাছাড়া তার কাছে সংরক্ষিত ফাইলটা স্থানান্তর করা খুব জরুরি । কারন এখানকার তথ্য নিশানের সন্ত্রাসী সংগঠনকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট ।

 

বাড়ি থেকে বের হয়ে আসলো অয়ন । ডানে বায়ে তাকিয়ে দেখলো একটা মাইক্রো বাড়ির পিছনে রয়েছে । দুইজন মানুষ সেখানে দাড়িয়ে সিগারেট টানছে আর একজন গাড়ির ভিতরে বসে রয়েছে । গ্লক নাইনটিন টা হাতে চালান করে দিলো সে । সাইলেন্সর লাগনো রয়েছে সেখানে, যার কারণে খুনি তার উপরে যখন গুলি করেছিলো তখন আশেপাশের ফ্লাটের কেউ কোন আলাপ পায়নি । দাড়ানো লোক দুজনের মাথা লক্ষ করে সে দুইবার গুলি করলো দূর থেকেই । কি হয়েছে এটা দেখার জন্য যখন ড্রাইভার বের হয়েছে তখন অয়ন তাকে ও গুলি করলো । অয়ন ভালো করেই জানে এদের কাছে থেকে কোন তথ্য পাওয়া সম্ভব নয় । এটা সাধারণ কন্ট্রাক্টর । শুধু কাজ কি এর ছাড়া এরা তেমন কোনই তথ্য দিতে পারবে না । সে সব তথ্যের জন্য এদের না বাঁচিয়ে রাখলেও চলবে তার । আট তলায় আক্রমনকারীর মত সে এদের পকেট হাতরে মোবাইল মানিব্যাগ সব নিয়ে নিলো অয়ন । বাইরের দুইজনের কাছে পাওয়া দুইটা Beretta 96A1 আর কোল্ট আনলোড করেলো অয়ন । ম্যাগাজিনের ক্লিপ দুইটা রেখে অস্ত্রগুলো ড্রেনে থ্রো করলো অয়ন গাড়িতে চড়ার আগ মূহুর্তে ।

 

এক ঘন্টা হয়েছে অয়ন মাইক্রোটা চালিয়ে শহরের বাইরে এসে একটা পুরানো হাইডআউট এ অবস্থান নিয়েছে । হাতের স্যাটেলাইট ফোনটি নিয়ে কল দিচ্ছে সে চতুর্থ বারের মত তার বস সাজিদুল রহমান কে । কল রিসিভ হয়েছে সে বুঝতে পারলো, যান্ত্রিক কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে :

– Confirm your identity

– Z22A43/K64X22H

– Identity confirm, Wait for while

মানুষের কন্ঠসর শুনতে পারলো এবার অয়ন । গত তিনবার সে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারেনি তার বস সাজিদুল রহমানের সাথে । একটা মিটিং এ ছিলেন তিনি ।

– Hello অয়ন

– We need to talk. Face to face.

– location Uttra,Second 14,road 15, house 45 at 0615 Hours.

দেখা করার অবস্থান আর সময় জেনেই কল কেটে দিয়েছে অয়ন । হাতে আট ঘন্টা সময় রয়েছে এর মধ্যে তার সেখানে পৌছাতে হবে । গাড়িতে পাওয়া মৃত ড্রাইভারের সিগারেটের প্যাকেট থেকে ষোল নং সিগারেট টা ধরিয়ে মাইক্রো তে আবার চেপে বসলো অয়ন ।

 

ছয়.

সায়নার বাসায় এখন বসে রয়েছে অয়ন । সায়না তার মতো একজন প্রাক্তন আলফা স্পেশাল ফোর্সের এজেন্ট । আলফা এজেন্টের কাজ ছিলো সম্পূর্ণ ক্লাসিফাইড । বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গোপন মিশন গুলোতে তাদের পাঠানো হতো । পরবর্তীতে তাদের থেকে কয়েকজনকে নিয়ে আবার নতুনভাবে টিম গঠন করা হয় । মাত্র চারজনজন এই নতুন আলফা টিমের কথা জানতো । আর শুধু তাদের মধ্যে কার্যকলাপ সম্পর্কে আলফা টিম বাদে  দুইজন জানতো । সাজিদুল রহমান সেই দুইজনের মধ্যে একজন । আলফা ফোর্সের সবথেকে বিশ্বস্ত লোক । তারপর হঠাৎ করে একসময় বন্ধ করে দেওয়া হলো আলফা ফোর্স কে । তবে বন্ধ করার পিছনে কিছু কারণ ছিলো । দেড় বছর ধরে তারা একটা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল টিমের পিছনে লেগে ছিলো । টিমের প্রধানের নাম অনুসারে তারা সন্ত্রাসী সংগঠন কে নিশানের দল বলে সম্মোধন করতো । অস্ত্র , মার্ডার, মাদকদ্রব্য, নারী পাচার এমন কোন অপরাধ নেই তারা করে না । যাই হোক এত প্রচেষ্টার পরও কাজের কাজ তো কিছুই হয়নি উল্টো তাদের ষোলজন এজেন্ট মার্ডার হয় ছয় মাসে । এই কেসে কোন ফলাফল দেখাতে পারেনি কোন আলফা স্পেশাল ফোর্স । আর উল্টো নিজেদের অনেকের পরিচয় নিশানের দলের কাছে ফাঁস হয়ে গিয়েছিলো । বর্তমানে নিশানের সংগঠন সম্পর্কিত পূর্বের মিশনগুলোর সব তথ্য অয়নের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে । সাথে কয়েকমাস নিজে খেঁটেখুজে তাদের সম্পর্কে বেশ অনেক কিছু জানতে পেরেছে অয়ন । সবথেকে বড় কথা তাদের লিডারের পরিচয় ঠিকানা সব বের করেছে কিছুদিন আগে । আর এসব তথ্য কেড়ে নেওয়ার জন্য হয়তো তার উপর আক্রমণ করা হয়েছিলো এটা বুঝে নেওয়া খুব কঠিন না । একমনে ভাবছে অয়ন, ফোর্স বন্ধ হবার পর সে একটি বেসরকারি কম্পানি তে জব করছিলো । তার অবস্থান দুইজন ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানার কথা না । তারা হচ্ছে সায়না আর সাজিদুল রহমান । যাদের অবিশ্বাস করার কোন প্রশ্নই আসে না ।

সায়না রেডি হয়ে অয়নের সাথে বাসা থেকে বের হয়ে আসলো । অয়নের দক্ষ চোখে খুজে বের করতে সময় লাগলো না যে সায়না সশস্ত্র । সায়না কে নিয়ে সে চলে আসলো তাকে দেওয়া লোকেশনে । সাধারণ একটা বাড়ি এটা । তবে যথেষ্ট অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এখানে । তাছাড়া অস্ত্রের কোষাগার হিসাবে ব্যবহার করা হতো, এখন অবশ্য কিছুই নেই সেগুলোর । তবে নিরাপত্তা রয়েছে যথেষ্ট । তা না হলে এখানে দেখা করতো বলতো না সাজিদুল রহমান । বাড়িতে ঢুকতে যাবার সময় অয়ন বুঝতে পারলো অলরেডি চলে এসেছে সাজিদুল রহমান । কারণ গেটের ভিতরে তার গাড়ি পার্কিং করা দেখা যাচ্ছে । সোজা বেসমেন্টে চলে আসলো অয়ন আর সায়না । সাজিদুল রহমান বসে রয়েছে সেখানে । তার থেকে একটু দূরে একজন বডিগার্ড দাড়িয়ে রয়েছে ।  । বয়স যদিও পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন হবে সাজিদুল রহমানের । তবে সে এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী । হ্যালো অয়ন ,কেমন আছো বলেই জড়িয়ে ধরলো অয়ন কে সাজিদুল রহমান । কোন মতে প্রাথমিক কথাবার্তা সেরে নিয়েই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলো অয়ন । ব্রিফকেসসহ ফাইলটা এগিয়ে দিলো সে সাজিদুল সাহেবের কাছে ।

–  ব্রিফকেসের মধ্যে নিশানের টিম সম্পর্কে সব তথ্য রয়েছে । আমার কাছে ফাইলটা রাখা নিরাপদ মনে করছি না । আর এই ফাইলের ব্যাপারটা আন-অফিসিয়ালি আপনার দায়িত্বে দিচ্ছি । আমার হাতের কাজগুলো শেষ করে দ্রুত ফাইলটা নিয়ে যেতে পারবো আশা করছি । আর হ্যাঁ আমি এখন উঠবো । এখানে বেশিক্ষণ থাকা নিরাপদ না ।

– হুম বুঝতে পারলাম , চিন্তা করো না । নিরাপদেই থাকবে ফাইল আর সম্পূর্ণ বিষয় টা এখনো গোপণ রয়েছে । এ মিটিংটার খবরও ।

– যদি কোনভাবে জানতে পারে আপনার কাছে এসব তাহলে আপনিও নিরাপদ না । কথাটা বলেই  উঠে দাড়ালো অয়ন ।

– চিন্তা করো না । আমার পরিবার আজকেই পাঠিয়ে দিচ্ছি বাহিরে আর তিশার মৃত্যুর জন্য আমি দুঃখিত । খুব ভালো মেয়ে ছিলো । ওর আদর যত্ন কথাগুলো খুব কষ্ট দিচ্ছে । তবে এখন আর কিছু করার নেই, সবার মৃত্যুবরন করতে হবে এক সময় । অয়নের মুখে অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো কথাটা শোনার পরপরই । সে একবার ও বলেনি তিশা মারা গিয়েছে । মুখে অদ্ভুত অভিব্যক্তি নিয়ে দাড়িয়ে থেকেই বললো অয়ন,

– আমি এখনো কাউকে তিশার মৃত্যুর কথা জানাইনি । ব্রিফকেসের মধ্যে রাখা ফাইলটা ফেইক । কথাটা শোনার. কয়েক মূহুর্ত পরে পকেট হাতরে একটা স্পিংফিল্ড এক্সডিএস বের করে আনলো সাজিদুল রহমান । আর বের করেই তাক করলো করলো অয়নের দিকে,

– কোথায় আসলটা ?

– প্রথম থেকেই আমার একটা কথা বারবার মাথায় ঘুরছিলো ওকে মারার কি দরকার ছিলো ? রুম সার্চ করার জন্য তাকে খুন না করে আহত করলেও পারতো । কারন সাধারণত কোন প্রফেশনাল লোক অকারণে খুন করে না ।  কথাটা বলতে বলতে অয়ন তার হাতটা কোর্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বের করে আনলো । এখন সেখানে গ্লক নাইনটিন দেখা যাচ্ছে । সোজাসুজি বডিগার্ডের উপর গুলি করলো অয়ন । সাজিদুল রহমান সাথে সাথে গুলি করলো অয়ন লক্ষ করে । খালি চেম্বারের ক্লিক শব্দ শোনা যাচ্ছে । অয়নের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠেছে । সাজিদুল রহমানকে যখন জড়িয়ে ধরেছিলো তখন তার স্পিংফিল্ড এর সাথে নিজের স্পিংফিল্ড টা চেঞ্জ করে নিয়েছিলো । সে প্রথম থেকেই সন্দেহ করেছিলো খুনের সাথে সাজিদুল রহমান দায়ী । কারণ এর এক সপ্তাহ আগে হঠাৎ এই কেসটা নিয়ে কথা বলছিলো সাজিদুল রহমান । সাজিদুল রহমান বেশ ভালোভাবেই জানতো অয়নের বাসায় রয়েছে ফাইলটা । সাজিদুল রহমান হয়তো রুম সার্চ করার সময় ধরা পরে যায় তিশার কাছে । তাই খুন করে তিশাকে । আর ফেইক নাটক সাজানোর জন্য লোক পাঠায় অয়নকে খুন করার জন্য । আর সাজিদুল রহমান ভালোভাবেই জানতো এসব লোক অয়নকে খুন করতে পারবে না । আর এ ব্যাপার নিয়ে কারো সাথে কথা বলতে যদি যায় তাহলে তার কাছেই সবার আগে আসতে হবে । অয়ন বলতে থাকলো , এর অর্থ দাড়ালো তিশা খুনিকে ভালোভাবেই চিনে । আর মধ্যে প্রথম সন্দেহভোজনদের মধ্যে আপনি পরেন । বলতে বলতে অয়ন খেয়াল করলো দরজা দিয়ে সশস্ত্র একজন প্রবেশ করেই তার দিকে অস্ত্র তাক করছে । তড়িৎ গতিতে তাকে লক্ষ করে গুলি করলো অয়ন । গুলির ধাক্কায় ছিটকে পরলো প্রবেশরত গার্ড । আর সাথে সাথে অয়ন চোখের কোনা দিয়ে লক্ষ করলো সাজিদুল রহমান লাফ দিয়ে জায়গা পরিবর্তন করেছে । তারাতারি অয়ন গ্লকটা ঘুড়িয়ে আনলো সাজিদুল রহমানের দিকে । নাহ্ দেরী হয়ে গিয়েছে । সাজিদুল রহমান বডিগার্ডের পরে থাকা অস্ত্র টা থেকে পর পর দুইবার গুলি করলো অয়ন কে লক্ষ করে । বুলেটের ধাক্কায় অয়ন লুটিয়ে পরলো ফ্লোরে । চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে তার । শেষ চেষ্টা করলো গ্লকটা তাক করার, কিন্তু হাতে কোন জোর পাচ্ছে না সে । চোখ অন্ধকার হয়ে যাবার আগে অয়ন দেখলো সায়না সাজিদুল রহমানকে লক্ষ করে গুলি করছে । সাজিদুল রহমান খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে সায়নার দিকে । তার দৃষ্টি বলছে সে এমন কিছু আশা করেনি ।

 

সাত.

চোখ মেলে বুঝতে পারলো অয়ন সে এখনো বেঁচে আছে । ডান বায়ে তাকিয়ে বুঝতে পারলো সায়নার বাসায় সে এখন । নিজের ক্ষতের দিকে তাকালো । ব্যান্ডজ করে দিয়েছে সায়না সেখানে । পাশের টেবিল থেকে তার হাতঘড়ি নিয়ে দেখলো সে । দুইদিন হয়ে গিয়েছে তার জ্ঞান ছিলো না ঘড়ি দেখে সে বুঝতে পারছে । চিন্তিত ভঙ্গিতে সে উঠে দাড়ালো আর রুম থেকে বের হয়ে আসলো অয়ন । রান্নাঘরে থেকে কাজ করার শব্দ ভেসে আসছে । অয়ন রান্নাঘরে দরজায় এসে দাড়ালো । সায়না কাজ করছে । এজেন্ট হোক বা অন্যকিছু হোক ঘরের কাজ করার ক্ষেত্রে বাঙালি মেয়েরা সর্বদাই ভালো ।

 

– গুড ইভেনিং অয়ন, শরীরের অবস্থা কেমন ? প্রশ্ন করলো সায়না ।

– আমার থেকে তুমি সেটা ভালো জানো সেটা উত্তরে বললো অয়ন । সাজিদুল রহমান…. কথাটা শেষ করার আগেই উত্তরে বললো সায়না…..

– ডেড । স্টোর রুমের ফ্রিজে ডেডবডিগুলো রয়েছে । চাইলে পরীক্ষা করতে পারো ।

– হু । ছোট করে উত্তর দিয়ে আবার প্রশ্ন করলো অয়ন… আর ডেডবডির জিনিসপত্র কোথায় ?

– তোমার রুমের কেবিনেটের মধ্যে দেখো । আর হ্যাঁ তিশার জানাজা করে কবর দিয়ে দিয়েছি । তার লাশ বেশি সময় ফেলে রাখা অন্যায়ের পর্যায়ে পরে ।

 

ধন্যবাদ বলে রুমে চলে আসলো অয়ন । ডেডবডিগুলো না রাখলেও চলতো । কিছু একটা খটকা লাগছে অয়নের । সায়না তার সবথেকে কাছের মানুষ ছিলো । এক সাথে বহু মিশনে তারা কাজ করেছিলো । তাকে অবিশ্বাস করার কোন কারণ দেখছে না । কেবিনেট খুলে অয়ন তার ফাইলটা ব্রিফকেসের মধ্যে লক করা দেখলো অর্থাৎ সায়না ফাইল টা পড়তে পারেনি । এটাই আসল ফাইল ছিলো । সেখানে আরো দুইটা স্প্রিংফিল্ড যার একটা তার নিজের অন্যটা সাজিদুল রহমানে, দুইটা Beretta 96A1, বেশ কিছু ওয়ালেট, মানিব্যাগ দেখলো অয়ন । ওয়ালেট আর মানিব্যাগ চেক করে কোন ক্লু দেখলো না অয়ন । সে ভালো করেই জানে সাজিদুল রহমানের উপরে অন্য কেউ রয়েছে । হয় নিশানের দল অথবা বার্ড নেস্ট । বার্ড নেস্টের নামটা মনে আসতেই অজান্তে বেইমানের দল বেরিয়ে আসলো অয়নের মুখ থেকে । অয়ন জানে সাজিদুল রহমান একটা গিনিপিগের  কাজ করেছে । অয়নের মাথায় এখন সুক্ষ্ম পরিকল্পনা কাজ করছে । সে দেখতে চায় কে কে সংযুক্ত রয়েছে এর সাথে । মাথায় যে চিন্তাটা আসছে তার সেটা হচ্ছে নিশানের ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল সংস্থা । কারণ বেশ কিছু মানুষেকে তারা চিহ্নিত এখানে । নিজের ভিতরে অশান্তি আর অস্থিরতা অনুভব করছে অয়ন । সম্পূর্ণ টিম ধ্বংস না করা পর্যন্ত সে নিজেও শান্তি পাবে না । স্প্রিংফিল্ড টা পকেটে চালান করে অয়ন স্টোর রুমে চলে আসলো ।

 

লাশগুলো দেখে তেমন কিছু চোখে না বাধলেও সাজিদুল রহমানের খোলা চোখ টা খুব আকর্ষণ করছে অয়ন কে । মনের একটা অংশ বলছে সমস্যা আছে কোথাও । ফ্রিজের দরজা টা লক করে দাড়িয়ে রয়েছে অয়ন সেখানে । চারপাশে তাকলো অন্য একটা দরজা দেখে খুললো সে । অস্ত্রের লকার এটা । রাইফেল, শটগান, বেশ কয়েক ধরনের হ্যান্ডগান আর গ্রেনেড রয়েছে সেখানে । এখনো এত অস্ত্র দিয়ে সায়না কি করে ? প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে । দেখার কিছু নেই দেখে দরজাটা লাগিয়ে নিজের রুমে চলে আসলো অয়ন । মাথায় একটা প্লান এসেছে তার । ফাইলটা নিয়ে সায়নার কাছে চলে আসলো । সায়না ফাইলটা পড়ে দেখোতো অয়ন বললো সায়নার উদ্যেশ্য । সায়না পাঁচ মিনিট ফাইলটা দেখে বললো, ব্লাফটা বেশ কাজে দিয়েছে তখন । বস পরীক্ষা না করেই তোমার কথাই বিশ্বাস করেছিলো । আসলটাকেই ফেইক ভেবেছে সে । তবে এটা আমাকে দেখানো ঠিক হচ্ছেনা । আমার নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে । তাছাড়া এখানে যে তথ্যগুলো রয়েছে সেগুলো জানাটাও বিপদজনক । ফাইল টা অয়নের হাতে দিয়ে সায়না চলে আসলো আবার রান্নাঘরে, যাওয়ার সময় বললো খাবার রেডি তুমি ডাইনিং টেবিলে বসে পরো আমি আসছি । সায়না চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রয়েছে অয়ন । সবকিছু ঠিকই রয়েছে তারপরও তার ভিতরে একটা খটকা লাগছে বারবার । সাজিদুল রহমানের খোলা চোখ কিছু একটা বারবার সন্দেহ জাগিয়েছে তার মনে । কেন যেন মনে হচ্ছে সায়না সাজিদুল রহমানের সাথে জড়িত এ ব্যাপারে । কারন সে যাই হোক সায়নার কাছে থেকে আক্রমণ আশা করেনি এটা অয়ন সিউর । রাষ্ট্রের সাথে এমন বেইমানির পর সায়নার কাছে থেকে আক্রমণ আশা করা উচিত ছিলো তার । তবে খটকাটা স্থায়ী হলো না । খাওয়াদাওয়া শেষ করে অয়ন বাসা থেকে বের হয়ে আসলো । হাতে ব্রিফকেসসহ নিশানের টিম সংক্রান্ত ফাইলটা নিয়ে একটা কুরিয়ার সার্ভিসের কাছে চলে গেল সে । কুরিয়ার করলো রাব্বানি কালাম নামের এক আত্নীয়ের কাছে । তার কাছে ব্রিফকেস সহ পাঠিয়ে দেওয়া ভালো । পরে গিয়ে ফাইলটা নিয়ে আসলেই হবে, ভাবছে অয়ন । ব্রিফকেস সহ ফাইলটা পাঠাতে বেশি সময় লাগলো না অয়নের । সায়নার বাসায় কাছে এসে সে দাড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে সে বেশকিছু অটোমেটিক রেকর্ডিং রেডিও ট্রান্সমিটার সেট করে এসেছিলো । যেগুলো সে সায়নার অস্ত্রের লকারে পেয়েছিলো । সায়না কে অয়ন যদিও খুব বিশ্বাস করে তারপরও এ মূহুর্তে কাউকে বিশ্বাস করা নিরাপদ না বেশ ভালোভাবেই জানে । তাই সায়না কিছু আলাপ পাওয়ার আগে কুরিয়ার করে নিশ্চিত করছে ফাইলের নিরাপত্তা । ট্রান্সমিটারের রেকর্ড গুলো চেক করলো সে বাহিরে দাড়িয়ে কিছুক্ষণ । হুম কিছু তথ্য তাহলে বের হয়ে এসেছে । স্বাভাবিকভাবে সায়নার সামনে এসে দাড়ালো অয়ন । লেপটপে কিছু একটা করছিলো সায়না । অয়নের রুমে আসার শব্দ শুনে ঘুরে তাকালো । অয়নের চেহারা খুব শান্ত দেখাচ্ছে তবে চোখ দুটো যেন জ্বলছে । এ দৃষ্টি চিনে সায়না, বহুবার এ ভাবে দেখেছে সে অয়ন কে । বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে সায়না ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে যাচ্ছে । সায়না নিজেও প্রস্তুত নিচ্ছে মনে মনে । সায়না ভালোভাবে জানে এ অবস্থায় অয়নকে জীবিত থামানোর সামর্থ্য ও শক্তি কোনটাই নেই তার । টিমের এমন একজন এজেন্ট অয়ন যে ক্লাসিফাইড ফাইল রাখার সামর্থ্য রাখে । আর আর বিশ্বস্ততা বেশি যার কারনে ফাইলটা তার কাছে সংরক্ষিত রাখা হয়েছিলো । তো অয়নকে টাকার লোভ দেখিয়েও দলে টানা যাবে না । সায়না উঠে দাড়ানোর আগেই তার উপর অয়ন ঝাঁপিয়ে পরলো । সায়না প্রস্তুত ছিলো । গুলি করলো অয়ন কে লক্ষ করে । গুলির আঘাতে ছিটকে পড়লো অয়ন । সায়না অয়নের পাশে এসে দাঁড়ালো । অয়নের হৃদপিণ্ড লক্ষ করে গুলি করতে যাবে সায়না ঠিক এমন সময় সায়নার ফ্লাটের দরজা ভেঙে চারজন লোক প্রবেশ করলো । একই সাথে পুরো ফ্লাট অন্ধকারে ছেয়ে গেল । সায়না অবাক হয়ে বোঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে এখন ।

 

আট.

মাইক্রোর ভিতরে আদি আর রায়হান বসে রয়েছে । দুজনের দৃষ্টি সামনে রাস্তা সংলগ্ন স্কুলটার দিকে । আদির দৃষ্টি শুধু স্কুলটার দিকে । তবে রায়হান একটু পরপর তার সবুজ চোখজোড়া সমস্ত রাস্তায় ঘুরিয়ে নিচ্ছে । সন্দেহজনক কিছুই চোখে বাঁধছে না তবে সর্তকতায় একটু ঢিল দিচ্ছে না রায়হান । একবার সে ভাবলো বলবে আদিকে ভাই বের হয়ে সামনাসামনি দেখে আসেন । পরক্ষণেই না করে দিলো চিন্তাটাকে । রিস্ক নেওয়ার কোন মানে হয়না । আদির দুই মেয়ে স্কুলটাতে পড়াশোনা করে । যদিও মাত্র প্লে শ্রেণীতে । তবে তাদের দেখার জন্য এখানে ছাড়া কোন বিকল্প নেই আদির । বাসার চারদিকে সর্বক্ষণ পুলিশ নজরদারি করে । তাকে দেখলেই ক্যাক করে ধরে বসবে এটা আদি জানে । গেট থেকে আদির দুই মেয়ে বের হচ্ছে তাদের মা অর্থাৎ আদির স্ত্রী সাবাতুন জান্নাত তিয়ানার সাথে । বিয়ের চার বছরের মাথায় আদি বাচ্চা নেয় । তিয়ানা চেয়েছিলো সবসময়ই যে তাদের ট্যুইন মেয়ে হোক । আর হয়েছে ও তাই । তাদের ইচ্ছের সাথে এভাবে বাস্তবতা মিলে যাওয়াতে অন্যকেউ খুশি না হলেও সবথেকে বেশি খুশি হয়েছিলো তিয়ানা । তিন মিনিটের বয়সে বড় মেয়েটার নাম রেখেছিলো অদ্বিতীয়া । নামটা প্রথম একটু অদ্ভুত লাগলেও বাস্তবিক তা নয় । আদির নাম থেকে Adi আর তিয়ানা থেকে Tiya নিয়ে রাখা হয়েছিলো এই নাম । দ্বিতীয় মেয়েটির নাম রাখা হয়েছে সমৃদ্ধি । এটা অবশ্য তিয়ানার পছন্দ করা নাম । তিয়ানা তার দুই মেয়ে অদ্বিতীয়া আর সমৃদ্ধিকে নিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলো । আদির খুব ইচ্ছে করছে একবার ডাক দিয়ে তাদের নিয়ে কোথাও ঘুরে আসে । কিন্তু সে জানে এটা সম্ভব না । তার সাথে দেখা হলেও এদের জন্য সমস্যা । কোনভাবে যদি পুলিশের লোকের কাছে তথ্য চলে যায় তাহলে খুব যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে তাদের । কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে শেষ পর্যন্ত ডাক দিলো না আদি । শুধু রায়হানের দিকে তাকিয়ে বললো,

– হেড কোয়ার্টারে ফিরে চলো রায়হান

– আদি ভাই আপনি কি দেখা করবেন একবার আপনার পরিবারের সাথে ?

– না এখনো সময় হয়নি । যখন সময় হবে তখন প্রকাশ্যে দেখা করবো ।

– সময়টা যে কবে আসবে ! দেড় বছর হয়েছে আপনার পরিবারের সাথে যোগাযোগ নেই । তাদের কত কষ্ট হয় কে জানে । আমার পরিবার বলতে তেমন কেউ নেই তাই আমার কারো কথা ভাবতে হয়না । কিন্তু আপনার তো……

– খুব একটা হয়না রায়হান বুঝলে । টাকা পয়সার সমস্যা হলে কিছু একটা মানা যেত । কিন্তু আমার বাবা এখনো ওদের দায়ীত্বে রয়েছে । খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা না ।

– আপনার মেয়েদের কিন্তু তাদের বাবার দরকার ।

– সময় এখনো তো যায়নি । হয়তোবা কোন একদিন পুষিয়ে দিতে পারবো । শেষ কথাগুলো খুব আস্তে বললো আদি । নিজের শুনতেও হয়তো কিছুটা অসুবিধা হয়েছে । আদি জানে এছাড়া তার কোন উপায় নেই । কোন নিশ্চয়তা নেই বেঁচে থেকে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে আসার । কে জানে কবে সম্ভব হবে নিজের পরিবারের সাথে এক বাসায় বসবাস করার । আদির মাথায় এখন অন্য চিন্তা আসতে শুরু করেছে । অয়ন কে ট্রাক করা হয়েছে কিনা জানার দরকার । রায়হান কে উদ্যেশ্য করে আদি কথা বলতে লাগলো,

– রায়হান অয়ন কে ট্রাক করা হয়েছে ?

– হয়েছে আদি ভাই । এক্স আলফা এজেন্ট সায়নার বাসায় রয়েছে সে ।

– নিশানের টিম সংক্রান্ত ফাইলটা কি এখনো তার কাছে রয়েছে ?

– যতদূর ধারনা করছি তার কাছেই রয়েছে । তাছাড়া এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সে অন্যের কাছে রাখবে এমন মনে হয়না । জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করবে ।

– টিম কি রেডি হয়েছে আমাদের ?

– আধা ঘন্টার মধ্যে তারা চলে আসবে আমাদের দেওয়া লোকেশনে ।

– গুড । ভারী অস্ত্র নিয়ে অপারেশন চালাতে হবে । ফাইলটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কতটা এটা নিশ্চয় বুঝতে পারছো । আলফা এজেন্সি বন্ধ হওয়ার পরেও অয়ন লেগে ছিলো নিশানের পিছনে । অনেক নতুন তথ্য তার কাছে রয়েছে । আর যতদূর জানি সেগুলো শুধু অয়নই জানে । তার কাছেই সবকিছু । যদি আমরা ফাইলটা দখল করতে পারি তাহলে নিশানের দল ধ্বংস করতে সময় লাগবে না । আমাদের বর্তমানে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী কে ধ্বংস করার সুযোগ পেয়েছি এবার । বারবার এ সুযোগ পাওয়া যাবে না । তাছাড়া সবকাজ খুব দ্রুত করতে হবে । নিশানের লোক ও যে সেখানে আক্রমণ চালাবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই বুঝেছো ?

– আমরা নিশানের আগেই আক্রামন করতে পারবো আশা করি । নির্লিপ্ত কন্ঠে উত্তরে বললো রায়হান । তার দৃষ্টি এখন পথের দিকে । তার সবুজ চোখজোড়া ধিকিধিকি করে জ্বলছে ।

 

সন্ধ্যা সাতটা বারো বাজে এ মূহুর্তে রায়হানের ঘড়িতে । এ মূহুর্তে মাইক্রোতে রায়হান, আদিসহ পাঁচজন রয়েছে । প্রতিজনই সেমি অটোমেটিক রাইফেল Colt M16A4 নিয়ে বসে রয়েছে । শুধু মাত্র আদি ছাড়া । Colt M16A4 প্রধানত ভিয়েতনামের যুদ্ধে প্রথম ব্যবহার করা শুরু হয় । বর্তমানে এটা আমেরিকান সামরিক বাহিনীর প্রধান রাইফেল হিসাবে বিবেচনা করা হয় । যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুসারে মোডিফাই করে নেওয়া যায় M16A4 কে এ কারনেই এর জনপ্রিয়তা খুব বেশি । ফ্লাশ লাইট, গ্রেনেড লঞ্চার, লেজার, স্পেশাল অপটিকস এসব একসাথে মাউন্টিং করার সুবিধাই হয়তো এ অস্ত্রটাকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে । M16A4 এর Muzzle Velocity প্রায় ৯৪৮ মিটার/সেকেন্ড । এই রাইফেলে প্রতি মিনিটে ৭০০ রাউন্ড গুলি করার ক্ষমতা রাখে । ওজন আনলোড অবস্থায় ৩.৪০ কিলোগ্রাম । আর লোডেড অবস্থায় ৩.৮৫ কিলোগ্রাম । এই গ্যাস অপারেটেড রাইফেলে 5.56 x 45mm NATO ক্যালিবারের ত্রিশ রাউন্ড ম্যাগাজিনের ক্লিপ ব্যবহার করা হয় । যার ইফেক্টটিভ রেঞ্জ ছয়শ মিটার । আদি তার নিজের হাতের গ্লক নাইটিন লোড করে নিলো সাথে সাথে অবশ্য সাইলেন্সার লাগিয়ে নিলো । রাইফেল গুলোতে সাইলেন্সারের বদলে সুপ্রেসর লাগানো রয়েছে । মুখে গ্যাস মাস্ক লাগিয়ে একসাথে সবাই মাইক্রো থেকে বেরিয়ে আসলো । রাস্তায় মানুষজন নেই যদিও কোন অদ্ভুত কারনে । হয়তো এলাকাটাই এমন ভাবছে আদি । যদিও এ মূহুর্তে তাদের দেখে সন্ত্রাসী দলের থেকে স্পেশাল ফোর্স বেশি মনে হচ্ছে । খুব দ্রুতই তারা দৌড়ে সায়নার ফ্লাটের সামনে চলে আসলো । আদি ইশারা দিতেই রায়হান দরজায় এক্সপ্লোসিভ প্লান্ট করতে শুরু করলো আর  আরেকজন পাওয়ার সুইচের কাছে গিয়ে পাওয়ার সুইচ অফ করার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলো । দরজায় এক্সপ্লোসিভ প্লান্ট করার সাথে সাথে তারা সবাই Armasight N-15 FLAG নাইটভিশন লাগিয়ে নিলো । বর্তমানে মর্ডান আর্মি সবথেকে বেশি N-15 নাইটভিশন ব্যবহার করে । চোখে নাইটভিশটা লাগিনোর সাথে সাথে গুলির শব্দ শুনে আদি বসে পরলো । অবাক হয়ে ভাবতে ফ্লাটের ভিতরে থেকে গুলির শব্দ আসলো কেন! তারা কি জেনে গিয়েছে তাদের অবস্থান সম্পর্ক ? সাথে সাথে আদি বাদ দিয়ে দিলো চিন্তাটা । না অন্য কিছু হচ্ছে । ইশারা দেওয়ার সাথে সাথে দরজা উড়িয়ে দিলো রায়হান । কয়েক সেকেন্ডের বিরতি তে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার সাথে সাথে ফ্লাটের মধ্যে প্রবেশ করলো আদির টিম । সবার সামনে রনি তারপর রায়হান এগিয়ে যাচ্ছে । ঠিক তার পরে আদি গ্লক তাক করে এগিয়ে যাচ্ছে । নাইটভিশনের মধ্যে সবুজ আলোয় অদ্ভুত লাগছে চারপাশটাকে । যদিও সবকিছু স্পষ্ট তবু সবুজ আলোতে সব অদ্ভুত লাগে । রনি ডাইনিং রুমে উকি দিয়ে পিছিয়ে আসলো হাঁটু গেড়ে ইশারা দিলো সামনে কেউ রয়েছে । রনি হাটু গেড়ে বসেই ডায়নিং এ প্রবেশ করলো সাথে সাথে পিছনে রায়হান আর আদি প্রবেশ করলো । ফ্লোরে কেউ শুয়ে হাঁপাচ্ছিল । সবুজ আলোর মধ্যেও আদির চিনতে অসুবিধা হচ্ছে না অয়ন আহত অবস্থায় পরে রয়েছে । রনিকে ইশারা দিতে সে অয়নের কাছে চলে গেল । সাথে সাথে আদি আর রায়হান অন্য রুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো । এবার আদি সামনে এগিয়ে ছিলো । রুমে উকি দিতেই আদি সায়নাকে স্পষ্ট দেখলো । সায়না গ্রিলের আলগা অংশগুলো দ্রুত খুলছে এই অন্ধকারের মধ্যে । আদি অর্ধবসা থেকে উঠে দাড়িয়ে দ্রুত সায়নার দিকে দৌড়ে যেতে লাগলো । পায়ের হাটার শব্দ শুনে সায়না সাথে সাথে ঘুরে অন্ধকারের মধ্যেই গুলি করলো । আদি প্রস্তুত থাকার কারনে কোন সুবিধা করতে পারলোনা সায়না । লাফ দিয়ে আদি সায়নার কাছে চলে আসলো । গ্রিলের ফাঁকে দিয়ে হালকা আলোর রশ্মি দেখা যাচ্ছে । ওই আলোতে দেখে সায়না আদিকে লক্ষ করে আক্রমণ করলো । তবে এবারও ভাগ্য সায়নার বিপরীতে । আদি বাম হাত দিয়ে সায়নার আক্রমণ ঠেকিয়ে সমস্ত শরীরের শক্তি দিয়ে ডান হাত দিয়ে সায়নার পেটে ঘুসি মারলো । সায়না যখন আঘাত সামলিয়ে নিচে যাচ্ছে ঠিক সেই মূহুর্তে আদি বাম হাত দিয়ে কারাত ঝেড়ে দিলো সায়নার ঘাড় লক্ষ করে । আঘাতটা ঠিক জায়গায় লাগার কারনে ঠিক সাথে সাথে সায়না অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরলো । সায়না মাটিতে লুটিয়ে পরার সাথে সাথে আদি রায়হানের দিকে ফিরলো । নাইটভিশনের সবুজ আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রায়হান কে ।

– সায়না কে মাইক্রোতে তুলে নেও । ও কেন গুলি করলো অয়ন কে জানার দরকার । বড় কিছু আশা করছি ওর কাছে থেকে আমি । কথাটা আদি বলেই অয়নের কাছে চলে আসলো । অয়নকে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে রাখা হয়েছে । মুখ হা করে সে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে । আদি ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে নাইটভিশনটা খুলে নিলো । অয়ন তার দিকে সাথে সাথে তাকালো । অয়নের চোখের দৃষ্টি বলে দিচ্ছে সে আদিকে চিনতে পেরেছে ।

– আদি স্যার । কথাটা বলে স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো অয়ন । আদি তাদের আলফা ফোর্সের ইন চার্জ ছিলো । যখন একাধিক এজেন্ট খুন হয় তখন আদি কয়েকজন কে নিয়ে নতুন আলফা টিম গঠন করে । তারপর যখন বন্ধ করে দেওয়া হয় তাদের এজেন্সিকে ঠিক তখনই আদি হাতেনাতে ধরা পরে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি করতে গিয়ে । এতদিন পরে আদিকে এভাবে আশা করেনি অয়ন । তাছাড়া বার্ড নেস্ট সম্পর্কে অজানা নেই তো তার ।

– তোমার অবস্থা সুবিধার মনে হচ্ছে না অয়ন ।

– সমস্যা নেই । অল্প কিছুক্ষণ টিকে আছি এটা আপনিও জানেন । মৃত্যু হাতছানি দিচ্ছে আমাকে । তো আপনি এখানে কেন ?

– আমার ফাইলটা দরকার ।

– আপনাকে কেন দিবো আমি ? আপনিও সন্ত্রাসী এখন । আর আমি সন্ত্রাসীদের সাহায্য করছি না ।

– নিশান তোমার পরিবার শেষ করছে । তোমার এ অবস্থার জন্য দায়ী । তাছাড়া সে তোমার আমার কমন শত্রু । আমাদের একে অপরকে সহায়তা করা উচিত ।

– আর কোন কারণ নেই ? এক মূহুর্ত তাকিয়ে বললো অয়ন । আদি কিছুক্ষণ তাকিয়ে অয়নের কানের কাছে নিজের মুখটা এগিয়ে দিলো । কি বললো সেটা আদি আর অয়নই ভালো বলতে পারবে । তবে যাই ই বলে থাকুক সেটা অয়নের ইচ্ছে পরিবর্তন করতে যথেষ্ট ছিলো । কয়েক মূহুর্ত থেমে পকেট থেকে কুরিয়ার এর কাগজ আর একটা ট্রান্সমিটার কন্ট্রোলার এগিয়ে দিলো অয়ন ।

– এই ঠিকানায় কিছুক্ষণ আগে কুরিয়ার করেছি ফাইলটা । যদি দ্রুত সেখানে যেতে পারেন হয়তোবা এখনই ফাইলটা পেয়ে যাবেন । ফাইলে নিশানের সম্পর্কে সব তথ্য রয়েছে । তার কয়েকজন বিশ্বস্ত লোকের কথাও লেখা রয়েছে । এদের ট্রাক করতে খুব অল্প সময় আপনার লাগবে । আর হ্যাঁ এই ট্রান্সমিটার কন্ট্রোলার এ সায়নার কিছু রেকর্ড রয়েছে । আমার ধারনা সে নিশানদের সাথে বহু আগে থেকে জড়িত । তার কারনেই আমাদের এজেন্সি বন্ধ হয়ে গিয়েছে । এতজন এজেন্ট মার্ডার হয়েছে । রেকর্ড গুলো চেক করে আর সায়নার কল লিষ্ট দেখলে হয়তো জানতে পারবেন তার বস কে । কথাটা শেষ করার সাথে সাথে কাশতে শুরু করলো অয়ন ।

– তোমাকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করছি ।

– দরকার নেই আদি স্যার । আমার সময় শেষ আপনি ভালো করেই বুঝতে পারছেন । শেষ মূহুর্তটা শান্তিতে থাকতে দিন ।

আদি উঠে দাঁড়ালো । আসলেই তার কিছু করার নেই । অয়নকে যত চেষ্টাই করা হোক না কেন বাঁচানো সম্ভব না । অয়নকে পিছনে রেখেই হেটে বেরিয়ে আসলো ফ্লাট থেকে আদি । সাথে সাথে মাইক্রোতে চেপে বসলো সবাই । এর মধ্যেই রায়হান সায়নাকে বেধেঁ গাড়িতে তুলে নিয়েছে । কয়েক মূহুর্তের মধ্যেই মাইক্রো চলতে শুরু করলো । আদি একবার পিছনে ঘুরে তাকালো । অজান্তেই তার চোখে পানি চলে আসলো অয়নের জন্য । দেশপ্রেমিক সন্তানগুলো কত দ্রুতই না চলে যাচ্ছে তাদের ছেড়ে । হয়তো এদের এমন আত্নত্যাগের কারনে এখনো এদেশ টিকে রয়েছে । হয়তো এদের জন্যই দেশের মানুষ এখনো স্বপ্ন দেখে । ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশা দেখছে প্রতিদিন ।

 

নয়.

গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই ঈশানের মনটা ভালো হয়ে গেল । ঝকঝকে পরিষ্কার দিন । সূর্য হালকা আলো দিচ্ছে । আর তাপমাত্রা ও বেশ কম । শীতের সময় এর থেকে বেশিকিছু আশা করাও অবশ্য অন্যায়ের পর্যায়ে পরে । ঈশান এ মূহুর্তে তার চাচা শওকত হাসানের বাড়ির গেটে দাড়িয়ে রয়েছে । গেটের কাছে যেতেই গেট খুলে দেওয়া হলো । এক পলকে পুরো এরিয়াতে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে আসলো ঈশান । না হলেও দশজন সশস্ত্র গার্ড দেখা যাচ্ছে । সবার হাতেই M4 Carbine রাইফেল, সাথে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আধুনিক যন্ত্রপাতিও লাগানো রয়েছে । M4 Carbine আমেরিকান অস্ত্র যেটা প্রথম উৎপাদন শুরু হয় ১৯৯৪ সালে । এটা মূলত ব্যবহার করা হয়েছিলো আফগানিস্তান আর ইরাক যুদ্ধে । এই রাইফেল এর muzzle velocity ৯২০ মিটার/সেকেন্ড । আর প্রতি মিনিটে ৯৫০ রাউন্ড গুলি করতে পারে । গ্যাস অপারেটেড এই রাইফেলে 5.56mm এর ত্রিশ রাউন্ডের ম্যাগাজিন ব্যবহার করা হয় যার ইফেক্টটিভ রেঞ্জ ছয়শ মিটার । গার্ডরা ঈশান কে চিনে বেশ ভালোভাবেই তাই তাদের মধ্যে কোন সর্তকতা লক্ষ করা গেল না । সোজা বাড়িতে প্রবেশ করলো ঈশান । ড্রইংরুমে বসে অপেক্ষা করছে ঈশান তার চাচা শওকত হাসানের জন্য । শওকত হাসান অবসরপ্রাপ্ত এজেন্ট । তিন বছর হয়েছে তিনি ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ থেকে অবসর নিয়েছেন । তার কর্মজীবনে খুব সন্তুষ্টজনক না । কারন তেমন কিছুই করতে পারিনি তিনি তার উপার্জন দিয়ে । ওই হিসাবে বাড়িতে এত সিকিউরিটি দেখে বলা যায় খাজনার থেকে বাজনা বেশি । প্রশ্ন আসতেই পারে এসব খরচ কিভাবে তিনি বহন করেন । বাবার কাছে থেকে উত্তরাধিকার সুত্র যেসব জমিজমা পেয়েছিলেন সেগুলো বিক্রি করে প্রায় পনের বছর আগে এজেন্ট থাকাকালীন সময়েই গার্মেন্টসের ব্যবসা শুরু করেন । খুব সময় লাগেনি তার এ খাত দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে । কারন এজেন্ট হওয়ার সুবাদে বেশ কিছু তথ্য তিনি আগেভাগেই পেতেন । বাজারের ভবিষ্যত সমস্যাগুলো যখন আগে আগে জানা যায় তখন সমস্যাগুলো সমাধান করাও খুব সহজ হয়ে যায় । ফলস্রুতিতে বেশ লাভজনক হয়ে দ্বারায় তার জন্য এ ব্যবসা । আট নয় বছরের মধ্যে ফুলেফেঁপে একাকার অবস্থা তার । বারো বছরের মাথায় একটা থেকে চারটা বিশাল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক হয়ে যান । বর্তমানের তার গার্মেন্টস ছাড়াও এক্সপোর্ট ইমপোর্টের ব্যবসা রয়েছে । সাথে দুইটা ওষুধ ফ্যাক্টরি । বলা যায় তিনি বিত্তবানদের একজন । শেষ বয়সে এসে এখন তার যদিও বসে বসে শান্তি করা উচিত তবে সেটা তার কপালে নেই । কারন তার ব্যবসা দেখাশোনার লোকের অভাব । স্ত্রী প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায় । তারপর আর বিয়েশাদী করেননি । একমাত্র মেয়েকে মানুষ করে বিয়ে দিয়েছেন । যে বর্তমানে লন্ডনে থাকে । শওকত হাসান বলা যায় ঈশানের বাবার মতই । ঈশানের বাবা মা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাবার পর তার কাছে ঈশান আর তার ভাই বড় হয়েছে । হয়তো ঈশানকেই তার ব্যবসার হাল ধরতে হবে । আর শওকত হাসানের ইচ্ছেও তেমন ।

 

চা দিয়ে গিয়েছে এক ফাঁকে । হাতে একটা পেপার নিয়ে ঈশান পেপার উল্টাপাল্টা করে দেখছিলো । সায়নার অপহরণ হওয়ার সংবাদ কোথাও নেই । অবশ্য এটা মিডিয়ার কাছে ফ্লাশ করা হয়নি । তবে গুলির শব্দের তথ্য পেয়ে সাংবাদিকরা বেশ ঝামেলা করেছে । আর অয়নের লাশটা তো মিডিয়ার কাছে প্রধান বিষয় । তারা যদিও কয়েকবার ফ্লাটের মালিক সায়নার ব্যাপার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলো । তবে পুলিশ তাদের আগ্রহ শুধু অয়নের লাশের উপর রাখার চেষ্টা করছে । আপাতত সায়নার ব্যাপারটা চাপা থাকাই ভালো । কারন সায়নার সাথে তাদের ব্রাঞ্চ বহুদিন কাজ করেছে । এবং সায়না কিডন্যাপ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ঈশানের সাথে কথা বলেছিলো । তার শেষ ভাষ্যমতে নিশানের সংগঠনের প্রায় সব তথ্য অয়নের কাছে রয়েছে । এখন নিশানের সন্ত্রাসী সংগঠন ধ্বংস করা ওয়ান টু এর কাজ । ঈশান হিসাব করে একটা জিনিস বুঝতে পারছে না অয়ন কেন তাদের এজেন্সি বন্ধ করে দেওয়ার পর তদন্ত চালিয়েছে । তাছাড়া যখন এতকিছু জানতে পেরেছে তাহলে কেন তথ্যগুলো ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের কাছে হস্তান্তর করেনি । তাহলে কি সে অন্য কোন সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে জড়িত ? বা সায়না তাদের সাথে বেইমানি করেনি তো ভাবছে ঈশান । এমন কি হতে পারে যে সায়না নিজেই তথ্য চুরি করেছে । আর পুরো ঘটনায় বার্ড নেস্টের সহায়তা নিয়ে এমনভাবে সাজিয়েছে যে মনে হবে তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে । নাহ্ সায়না তাদের সাথে এ কাজ করবে না । তাহলে যে তার ফল কি হবে সেটা সায়না ভালোভাবেই জানে । তারপরও সম্ভাবনা থেকে যায় । চা শেষ এমন সময় পায়ের শব্দ শুনে তাকালো ঈশান । তার চাচা শওকত হাসান আসছে । কিছুক্ষণের মধ্যে সে এসে বসলো ঠিক ঈশানের বিপরীত দিকের সোফাতে ।

– কিরে কি খবর তোর ঈশান ?

– ভালো ।

– বার্ড নেস্টদের ধরতে আর কতদিন লাগবি ?

– জাল গুটানো এখনো শুরু হয়নি । ট্রাকিং চলছে ।

– কতদূর ট্রাক করছিস ?

– সমস্যাটা হচ্ছে কি । জাহাঙ্গীর রায়হানের জুতাতে ট্রাকিং ডিভাইস লাগতে পেরেছিলো । রায়হান কয়েকবার জুতা পরিবর্তন করেছে । তাই সায়নার উপর আক্রমণটা ট্রাক করা সম্ভব হয় নি । তবে রায়হানের বাসভবন আর তাদের কয়েকটা হাইডআউট লোকেট করা হয়েছে । আমরা মোটামুটি ধারনা করতে পারি সায়নাকে কোথায় রাখা হয়েছে । আর আদিকে কোথায় গ্রেফতার করা যেতে পারে ।

– গ্রেফতার করার মিশন কখন চালাবি ?

– খুব শীঘ্রই । কয়েকদিনের মধ্যে ওদের বড় একটা অস্ত্রের চালান আসবে । ওই সময়ে আক্রমণ করলে বেটার । কারন প্রমাণসহ গ্রেফতার করলে সহজে তাদের আটকাতে পারবো । নাহলে তো আইনের ফাক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাবে ।

– সেটা না হয় বুঝলাম । হাতে না হাতে ধরতে চাচ্ছিস । তবে আমি এখনো সেদিনের কথা বলবো । যেদিন রায়হানের জুতাতে ট্রাকার লাগানো হয়েছিলো সেদিন একসাথে গ্রেফতার করতে ভালো হত । সবকয়টাকে না ধরে আদি আর রায়হান কে গ্রেফতার করলেই যথেষ্ট । পুরো সংগঠন ভেঙে পরবে তাতে ।

– তাদের কে গ্রেফতার করতে যাচ্ছে চাচা ?

– তাহলে ? কি করবি ?

– জীবিত না ধরতে পারলেও সমস্যা নেই । অস্ত্র চোরাচালানে ধরা পরে ক্রশফায়ারে নিহত চোরাচালানের দুই প্রধান এই নিউজটাই ভালো দেখাবে নিউজপেপারে ।

– দেখ যা ভালো মনে করিস । তবে নিজে ফেঁসে যাস না । বুঝলি ? কয়েক মূহুর্ত বিরতি নিয়ে কথাটা বললো শওকত হাসান । সে বেশ ভালোভাবেই ঈশানের চিন্তাধারা ধরতে পারছে । বার্ড নেস্ট কে গ্রেফতার করে লাভ নেই । বড় বড় নেতা, রাজনৈতিক দলগুলো এদের সাহায্য করবে । কিছুদিনের মধ্যে এরা আবার মুক্ত আকাশে ঘুরে বেরাবে । আবার নতুন করে ব্যবসা শুরু করবে । এভাবে তাদের থামানো কোনভাবেই সম্ভব না । যদি গ্রেফতার না করে সেখানেই তাদের গুলি করে তাহলে দেশের সবার জন্য ভালো হবে । শওকত হাসানের চিন্তার সুতো পায়ের শব্দে ভেঙে গেল । মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই তার নাতনী নুঝাত কে দেখলো । কয়েকদিন হয়েছে তার বড় মেয়ের ঘরের সন্তান লন্ডন থেকে তার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে । প্রতি বছরই নুঝাত তার নানার কাছে একবার আসে । এবারও এসেছে তবে একটু দেরী করে ।

– নানাভাই কি করো ? আরে মাসুদ মামাও দেখি এসেছেন! নুঝাত তার মামা ঈশানের প্রথম নামটাই সম্মোধন করে ডাকে । কখন আসলেন ? আর আপনি এসেছেন আমাকে একবার ডাক দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না ?

– মাত্র বিশ মিনিট হবে এসেছি বুঝলি নুঝাত । কথা বলছিলাম তোর নানার সাথে ।

– হু যাই হোক আপনাদের কথা শেষ হয়েছে ?

– এইতো প্রায় শেষ । কেন তোর সাথে কি মার্কেটে যেতে হবে ?

– হু ঠিক ধরেছেন । তবে কিভাবে বুঝলেন এটা প্রশ্ন করবো না । এখন রহস্য মনে হচ্ছে । আপানকে যদি প্রশ্ন করি তাহলে তার সহজ একটা উত্তর দিবেন যা শুনলে রহস্য আর রহস্য থাকবে না । যাই হোক আপনি তারাতারি উঠুন । আমার অনেক কাজ আছে বাহিরে । আপনাকে পেয়ে অনেক সুবিধা হবে ।

– কিন্তু রে নুঝাত অনেক কাজ আছে রে মা । অফিসে যেতে হবে ।

– আচ্ছা ঠিক আছে আপনার যেতে হবে না । আমি একাই যাচ্ছি ।

– আচ্ছা ঠিক আছে রে মা আমি যাচ্ছি তোর সাথে । এখন আর রাগ করিস না । একটু হাসি দে । তোর রাগী মুখ দেখতে ভালো লাগেনা বুঝলি ? কথাটার মাঝে স্নেহ মমতা ছিলো । নুঝাত আর রাগ করে থাকতে পারলো না ফিক করে হেসে দিয়ে তার মামা ঈশানের সাথে বেরিয়ে পরলো মার্কেটের উদ্দেশ্য ।

 

শওকত হাসানের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পরলো ঈশান নুঝাতের সাথে । শওকত হাসানের বাড়ি থেকে বের হবার পর রাস্তার বিপরীতে একটা গাড়ির উপর ঈশানের দৃষ্টি চলে গেল । এ বাড়িতে আসার সময় গাড়িটি তাকে ফলো করছে এমন একবার মনে হয়েছে । এখন আবার বাড়ির সামনে দাড়িয়ে রয়েছে ব্যাপারটা সন্দেহজনক । এক দৃষ্টিতে ঈশান তাকিয়ে রয়েছে গাড়িটার দিকে । ঈশান নুঝাত কে গাড়িতে বসতে বলে সোজা এগিয়ে যেতে লাগলো গাড়িটির উদ্যেশে । এ মূহুর্তে ঈশানের ডান হাত তার অস্ত্রের উপর চলে গিয়েছে । চোঁখের পলকে সেটা থেকে গুলি করার জন্য ঈশান প্রস্তুত । গাড়ির সাইড গ্লাস নামানো । কাছাকাছি প্রায় চলে এসেছে ঈশান এমন সময় গাড়িটা চলতে শুরু করলো । ঈশান চুপচাপ দাড়িয়ে রয়েছে । কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটা রাস্তা দিয়ে গায়েব হয়ে গিয়েছে । তার কার্যক্রম লক্ষ করা হচ্ছে এটা সে আশা করেনি । খুব চিন্তিত বোধ করছে ঈশান । কারন গাড়ি ছাড়ার আগে সে ড্রাইভারের চোখ দেখেছিলো । এক জোড়া সবুজ চোখ তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলো ।

 

দশ.

আদির প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করছে । তার এখন একটা ঘুম দরকার কিন্তু এ মূহুর্তে ঘুমের থেকে বেশি প্রয়োজন সায়নার সাথে কথা বলার । যদিও আগে কয়েকবার প্রশ্ন করেও কোন লাভ হয়নি সায়না কে । কিছুই স্বিকার করছে না । তার ভাষ্যমতে হচ্ছে অয়ন তার উপর আক্রমণ করেছে তাই বাধ্য হয়ে সে অয়নকে গুলি করেছে । আদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো । এবারই শেষবার । কিছু যদি স্বিকার না করে সায়না তাহলে তাকে অকারণে বাঁচিয়ে রাখার কোন প্রয়োজন নেই । অয়ন আদির প্রিয় কয়েকজনের মধ্যে একজন ছিলো । ছেলেটার বিচক্ষণতা আর দেশপ্রেম দেখে আদি সবসময় অবাক হয়ে যেত । তবে এখনো আদি ভেবে বের করতে পারছে না কিভাবে অয়ন নিশানদের সম্পর্কে এত কিছু জানতে পেরেছে । কোন লিংক থেকে সে এইসব তথ্য বের করেছে এটা আদির কাছে বিষ্ময়কর । ছেলেটা যদি বেঁচে থাকতো তাহলে হয়তো জানা যেত ভাবছে আদি । তবে যেহেতু এখন আর তাকে প্রশ্ন করার কোন সুযোগ নেই তাই আপাতত তার দেওয়া তথ্যের উপর ভরসা করা ছাড়া কোন উপায় নেই । তাছাড়া আদি ফাইলটা ভালোভাবে পড়ে দেখেছে । যেসব তথ্য রয়েছে এগুলো ভুল মনে হচ্ছে না । তাছাড়া নিশানের দলের কয়েকজন কে ট্রাকিং করে আদির মনে হচ্ছে না সব ঠিকই রয়েছে । এখন শুধু তাদের উপর আক্রমণ করে ধ্বংস করতে হবে সম্পূর্ণ সংগঠন কে । প্রথমে লিডার নিশান আর তার বিশ্বস্ত লোকজনকে সরিয়ে দিতে হবে । এরপর একে একে তাদের ব্যবসাগুলো ধ্বংস করতে হবে । আদি অলরেডি রায়হানকে বলেছে এদের সবাইকে ট্রাকিং করতে । আর গত দুই দিনে প্রায় নিশানের সব ব্যবসা লোকেট করা হয়ে গিয়েছে । এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুসারে নিশানের চারটা অস্ত্রের গুদাম, দুইটা ব্রোথেল, নারী পাচার করার লিংকগুলো ,মাদকের ব্যবসাগুলো খুঁজে বের করা হয়েছে । যদিও নিশানের বেশ কয়েকটা বৈধ ব্যবসা রয়েছে । তবে সেগুলো নিয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই আদির । ভাবতে ভাবতে সায়নার রুমে চলে আসলো আদি । সায়নাকে স্টিলের চেয়ারে ভালোভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে । টর্চারের চিহ্ন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে । সায়নার সামনে একটা চেয়ার নিজেই টেনে বসে পরলো আদি । আদির বসার শব্দ পেয়ে সোজা হয়ে তার দিকে তাকালো সায়না । তার ঠোঁটের কোনায় শুকনো রক্ত লেগে রয়েছে ।

– কেমন আছো সায়না ? কোন উত্তর আসলো না সায়নার পক্ষ থেকে । সোজা কাজের কথায় চলে আসলো আদি, দেখো সায়না এখন আর লুকোছাপা করার কিছু নেই । তুমি ভালোভাবেই জানো আমরা এখন কি করি । আইনের বাহিরের মানুষ আমরা । আইনের কথা ভেবে যে তোমাকে কিছু করতে পারবো না, এমন না এখন পরিস্থিতি । তোমাকে কয়েকবার প্রশ্ন করে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানতে পারিনি । যেগুলো বলছো সেগুলো আমরা জানি ।

– তাহলে নিশ্চয়ই এটা জানেন যে আমি ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের সাথে কাজ করছি ।

– সেটা তো করছোই । তবে তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে তুমি নিশানের খুব বিশ্বস্ত লোক । তাই আমার অনেকগুলো প্রশ্ন জমে রয়েছে । কি প্রশ্ন নিশ্চয়ই ভাবছো । অতীতে যখন আমাদের এজেন্সি সচল ছিলো তখন আমরা বেশকিছু তথ্য জানতাম । তার মধ্যে একটা হচ্ছে, নিশান তার দলের সবার তথ্য ভালোভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছে । সেগুলোর মধ্যে প্রতিটি মানুষের বায়োডাটা, তাদের অবস্থান, এমনকি পরিবার সম্পর্কে অসংখ্য তথ্য রয়েছে । তাছাড়া তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত সকল তথ্য তারা সংরক্ষণ করেছে । আমি সেগুলো চাই । আর তুমি জানো সেগুলো কোথায় রয়েছে তাই নয় কি ?

– আমি নিশানের দলের লোক না । তাছাড়া আমিও এ তথ্যটা জানি । যে তারা সবার তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে । যাতে কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলেও উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে । কিন্তু আমি যখন তাদের দলের কেউ না তখন আমি কিভাবে বলবো ?

আদি কয়েক মূহুর্ত তাকিয়ে সায়নার বাম হাঁটুতে গুলি করলো । সায়না সাথে সাথে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করলো । যদিও সেটা তার জন্য খুব একটা সুবিধার হলো না । চেয়ারে শক্তভাবে বাঁধা থাকার কারনে চেয়ারে থাকতেই বাধ্য হলো সায়না । তবে লাফ দেওয়ার জন্য চেয়ার কাত হয়ে ফ্লোরে পরে গেল । আদি ইশারা দেওয়ার সাথে সাথে একজন চেয়ারটা সোজা করে আদির সামনে রাখলো । সায়নার মুখ যন্ত্রনায় কুঁচকে যাচ্ছে । সাথে যন্ত্রণার চিল্লাছে সায়না । আদি একটা সিগারেট জ্বালিয়ে সায়না কে দেখছে চুপচাপ । সায়নার কারনে তার টিমের অনেকজন মার্ডার হয়েছে এটা সে ভুলতে পারছে না । তাদের কত প্রচেষ্টা সব বিফলে গিয়েছিল এই মেয়েটার জন্য । যদি এ মেয়েটা তথ্য নিশানের কাছে পাচার না করতো তাহলে তার এজেন্সি বন্ধ হতো না আর এতজন এজেন্ট মার্ডার হতো না । বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদন্ড হওয়া উচিত । আইনের মধ্যে থাকলে হয়তো এ কাজ করতে পারতো না আদি । তবে এখন সে আইনের লোক না যে সায়না কে কিছু করতে পারবে না । এখন যদি চায় সে সায়নাকে মার্ডার ও করতে পারে । কেউ তাকে থামানোর নেই । এটা যতক্ষণ সায়না বুঝবে না ততক্ষণ কিছুই স্বিকার করবে না । সায়নাকে বুঝতে হবে তাদের কথামতো না চললে তাকে তারা বাঁচিয়ে রাখবে না । সিগারেট শেষ করে আদি আবার তাকালো সায়নার দিকে । অনেকটা সামলিয়ে নিয়েছে মেয়েটা । শত হলেও এ মেয়েটা এক সময় তার অধীনে কাজ করেছে । আর আদি খুঁজে খুঁজে সেরাদের তার টিমে রেখেছিলো । আর সবাইকে ভালোভাবে ট্রেনিং দিয়েছিলো । যথেষ্ট ট্রেনিং প্রাপ্ত একজন এজেন্ট এ পরিবেশ সহ্য করার ক্ষমতা রাখবে এটাই স্বাভাবিক ।

– সায়না আমার কথা শুনছো ?

– হু । অনেক কষ্টে জবাব দিলো সায়না ।

– আমি এখন আইনের রক্ষক না যে তোমার কোন শারীরিক ক্ষতি করতে পারবো না । তোমার বেঁচে থাকা আমার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল । তোমার নিশ্চয়ই নিজের জীবনের থেকে মূল্যবান কিছু নেই তাই না ? তুমি এমনিতেই মৃত্যুদন্ড পাওয়ার মত কাজ করেছো । অয়ন আমার সবথেকে প্রিয় এজেন্ট ছিলো । নিজের হাতে তাকে আমি ট্রেনিং দিয়েছিলাম । তাকে তুমি খুন করেছো ।

– এটা আপনার পয়েন্ট থেকে মনে হচ্ছে আমি অন্যায় করেছি । আর আমার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে আমি ঠিক করেছি । আমি যদি তাকে গুলি না করতাম তাহলে সে আমাকে খুন করতো । নিজেকে বাঁচানো সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ তাই না ?

– হয়তোবা তাই । সবাই তার নিজের পয়েন্ট থেকে সবকিছু বিবেচনা করবে । যেমন আমি এখন আমার পয়েন্ট থেকে করবো । তোমার পয়েন্ট থেকে না । তাছাড়া কেন অয়নকে খুন করেছো এই বিষয় নিয়ে কথা বলে আমার সময় নষ্ট করবো না । আমি যা জানতে চাই সেগুলো বললে তোমাকে বেঁচে থাকার সুযোগ দিবো ।

– আমি নিশানের দলের সাথে সম্পৃক্ত না ।

আদি এক মূহুর্ত সায়নার দিকে তাকিয়ে এবার ডান হাঁটুতে গুলি করলো । কোন সন্দেহ নেই আদির যে সায়না নিশানের সাথে সম্পৃক্ত । আর এত সহজে এটা স্বিকার করবে সায়না এটা আদি আশাও করেনা । এত খারাপ ট্রেনিং আদি দেয়নি এদের যে সহজে স্বিকার করবে । সায়না কিছুক্ষণ চিৎকার দিয়ে থামার পর আবার আদি কথা বললো,

– তো সায়না এখনো কি একই কথা বলবে ? তাহলে আমার আরো ভয়ঙ্কর হতে হবে তোমার সাথে । তুমি আজ খারাপ রূপ দেখার যখন এতটাই আগ্রহী তখন আমি কিভাবে না করি তাই না ? আদি ইশারা দিতেই একটা কাটিং প্লাস তার হাতে একজন দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সবাই । এখন কারো রুমে না থাকাতাই বেটার । কোন কথা না বলে আদি সায়নার ডান হাতের তর্জনীতে প্লাসটা ধরলো । সায়না এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে নিজের আঙ্গুলের দিকে । এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না সত্যিই আদি তার আঙুল কাটতে যাচ্ছে । আদি আস্তে আস্তে বললো, আমিও দেখতে চাই তুমি কতক্ষণ চুপ থাকতে পারো । কথাটা বলেই আদি কাটিং প্লাসে গায়ের সমস্ত শক্তি ঢেলে দিলো । কট করে একটা শব্দ হয়ে সায়নার আঙুল কেটে ফ্লোরে পরলো । কাটা আঙুলটা ফ্লোরে পরার সাথে সাথে আদি পরের আঙুলটি প্লাসে মধ্যে গুঁজে দিলো । কোন কথা না বলে এক চাপে দ্বিতীয় আঙুলটা কেটে ফেললো । সায়না অসহ্য যন্ত্রণায় চেচাচ্ছে । তবে সেদিন কোন নজর নেই আদির । তৃতীয় আঙুল যখন প্লাসে সেট করছে আদি এমন সময় সায়না হাঁপাতে হাঁপাতে কথা বললো,

– থামেন । আমি বলছি সব । থামেন এখনই ।

আদির মুখে একচিলতে হাসি ফুটে উঠেছে । সে ভালোভাবে বুঝতে পারছে সায়না এবার হার মেনেছে । এখন সবই স্বিকার করবে । তাছাড়া তার কোন উপায় নেই । যদি স্বিকার না করে সব সত্য তাহলে যে আদি একটুও করুনা দেখাবে না এটা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে সায়না । আদি তার লোকদের ডাক দিয়ে সায়নার হাত পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিতে বললো । ব্যান্ডেজ করা অবস্থায় আদি কথা বললো,

– তো সায়না কোথায় রয়েছে যেটা আমি চাচ্ছি ?

– নিশানের বাসার তিন তলায় তার সেফ লকার রয়েছে । সেখানেই সবকিছু ।

– তথ্য কিভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে ?

– হার্ডডিস্কে সব তথ্য রয়েছে ।

– হার্ডডিস্কে কি ধরনের সিকিউরিটি ব্যবহার করা হয়েছে ?

– আমার জানা মতে হার্ডডিস্কে কোন লক ব্যবহার করা হয়নি । কারন…

– কি ? তার বাড়িতে প্রচুর গার্ড রয়েছে তাই ?

– তা তো রয়েছে । তবে কথা হচ্ছে অন্য কারনে সে হার্ডডিস্কে কোন লকার ব্যবহার করেনি । সেফ লকারের অবস্থান নিশান বাদে একে তো কেউ জানে না । তাছাড়া লকারে খুব হাই সিকিউরিটি ব্যবহার করা হয়েছে ।

– কতটা হাই সিকিউরিটি ?

– বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে লক করা হয়েছে লকার । তার দুই হাতের প্রিন্ট ব্যবহার করা লাগবে । এরপর তার রেটিনা স্কান করা হয় । তারপর না হয় লকার খুলবে ।

– বেশ ঝামেলার কাজ বলা যায় ।

– আপনি তার লকারের কাছেই যেতে পারবেন না । বাড়িতে যে পরিমাণ গার্ড রয়েছে, তাদের এড়িয়ে সেখানে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব না । যদি আর কি আপনি সেফ লকারের অবস্থান জানতে পারেন ।

– সেটা জানা খুব কঠিন হবেনা । বাড়ির কন্সট্রাকশন যারা করেছে তাদের ধরলে খুঁজে বের করা খুব কঠিন হবে না । যাইহোক নিলয় প্লাসটা দেও তো । কথাটা বলার সাথে সাথে নিলয় নামের লোকটি আদির হাতে প্লাস ধরিয়ে দিলো । আদি কোন কথা না বলে সায়না আঙ্গুল প্লাসে গুঁজে দিয়েই চাপ দিলো । কট করে একটা শব্দ হয়ে সায়না আঙ্গুল ফ্লোরে পরলো । সায়না অমানবিক স্বরে চেচাচ্ছে ।

– আমি তো সব সত্য বলেছি । তারপরও কেন..?  হাপাতে হাপাতে কথাটা বললো সায়না । আদি এক মূহুর্তে নিশ্চুপ থেকে সায়নার অন্য আঙ্গুল সেট করলো কাটিং প্লাসে ।

– আমি জানি তুমি সব সত্য বলছো । তবে এটা এখন গুরুত্বপূর্ণ না । কথাটা শেষ করে আদি চতুর্থবারের মত চাপ দিলো প্লাসে । প্রতিশোধের নেশা পেয়ে বসেছে তাকে ।

 

এগারো.

তার তিনটা । চারদিকে কোন সাড়াশব্দ নেই । অবশ্য এই জায়গায় এত রাতে কোলাহল আশা করাও অন্যায় । এই কথাটাই ভাবছিলো ঈশান । নিঃশব্দে ধীরগতিতে ঈশান হেটে যাচ্ছে । উদ্যেশ্য একশ মিটার দূরের একতলা বাড়ি । চারপাশে একবার মাথা ঘুরিয়ে আনলো ঈশান । জায়গায় ঢাকা শহরের এত কাছে হওয়া সত্ত্বেও উন্নয়নের কোন ছাপ দেখা যাচ্ছে না । এলোমেলো ভালো অল্প কিছু বাড়ি তোলা হয়েছে । দোকানপাটের সংখ্যা এতটাই কম হয়তো হাতে গোনা যাবে । বাড়ির কাছে চলে আসার সাথে সাথে ঈশান দরজার পাশে দাড়ালো । এ মূহুর্তে তার সাথে নিজের টিমের চারজন বাদেও স্পেশাল ফোর্সের চারজন রয়েছে । সবাই দ্রুত নিজের অবস্থানে চলে গেল । কিছুক্ষণের মধ্যে একজন দরজায় প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে দিলো । সবার হাতে লোডেড অস্ত্র । ঈশান নির্দেশ দেওয়া আগে কি মনে করে দরজার লকে হাত দিয়ে ঘুরানোর চেষ্টা করলো । আর ঈশানকে অবাক করে সাথে সাথে দরজা খুলে গেল । ঈশান নিজের বিষ্ময় তারাতারি সামলে নিয়ে ভিতরে ঢোকার নির্দেশ দিয়ে চারজনের পরে রুমে প্রবেশ করলো । ভিতরে নিকষ অন্ধকার । তবে সবাই ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে নিয়েছে তাই দেখে কোন অসুবিধা হচ্ছে না । পুরো বিল্ডিং খালি । এমনকি দেখে মনে ও হচ্ছে না এখানে কোনকালে মানুষ থাকতো । পকেট থেকে ট্রাকিং ডিভাইস বের করে ঈশান আবার অবাক হলো । ট্রাকিং ট্রান্সমিটার এখানেই রয়েছে ট্রান্সমিটার যেটা রায়হানের জুতাতে সেট করা হয়েছিলো । ঈশানের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না তাদের ট্রাকিং ট্রান্সমিটারটি আগেই দেখে ফেলেছে আদিরা । তাই এখানে কোথায় ফেলে রেখে গিয়েছে । ট্রাকিং ডিভাইসের দেওয়া সিগনাল লক্ষ করে ঈশান চলে আসলো ছোট একটা রুমে । ফ্লোরের মাঝখানে থেকে সিগনাল পাওয়া যাচ্ছে । কিন্তু ডিভাইসটি দেখা যাচ্ছে না । কি মনে হলো ঈশানের । ফ্লোরে বিছানো ম্যাট সরিয়ে দিলো । সাথে সাথেই একটা আন্ডারগ্রাউন্ডে যাওয়ার রাস্তার দরজা বেরিয়ে পরলো । ঈশান নির্দেশ দিতেই টানাটানি করে দরজাটা খুলে ফেলা হলো । সবাই হাতের অস্ত্র দিয়ে সর্তক অবস্থায় তাক করে রেখেছে সেখানে । ঈশানের নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলো তারা । নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে একে একে প্রবেশ করলো চারজন । বাকিদের আন্ডারগ্রাউন্ডের দরজার বাহিরে দাড়া করিয়ে ঈশান প্রবেশ করলো সেখানে । সবাই সর্তকতার সাথে এগুলো । যেকোন মূহুর্তে সবার হাতের অস্ত্র থেকে মুহুমুহু গুলি ছুড়তে প্রস্তুত । নিচে জমাট বাধা অন্ধকার । তার মধ্যে শক্তিশালী লাইটের আলো চিড়ে যাচ্ছে । নিচে নামার সাথে সাথে একটা রুমের দরজা দেখলো ঈশান । হাতল ধরে মোচড় দিতেই বোঝা গেল সেটা লক করা । এ মূহুর্তে সময় নষ্ট করার কোন ইচ্ছে নেই ঈশানের । পরপর দুইবার গুলি করলো সে লক এর উপর । দরজা খোলার সাথে সাথে জাহাঙ্গীর ভিতরে উকি দিয়ে পিছিয়ে আসলো । ভিতরে কাউকে দেখা যাচ্ছে । নির্দেশ দিতেই একে একে সবাই ভিতরে প্রবেশ করলো । উল্টো ভাবে দেখা যাচ্ছে কেউ একজন চেয়ারে বসে আছে । জাহাঙ্গীর আর ঈশান আস্তে আস্তে এগিয়ে চেয়ারে থাকা লোকটার সামনে দাড়ালো । লাইটের আলো চেহারায় মারার সাথে সাথে অবাক হয়ে গেল তারা । সায়নাকে চেয়ারে বাধা অবস্থায় রয়েছে । তার দুইহাতে একটা আঙ্গুল দেখা যাচ্ছে না । দুই পায়ের রক্তাক্ত রুপ দেখে বোঝা যাচ্ছে গুলি করা হয়েছে পায়ে । দ্রুত ঈশান সায়নার পালস চেক করে হতাশ হয়ে পরলো । শরীর বরফের মত ঠান্ডা । বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না অন্তত চব্বিশ ঘন্টা আগে মারা গিয়েছে সায়না । আর মৃত্যুর কারন সম্ভবত রক্তক্ষরণ । লাইটের আলোতে খুঁজে পেতে সময় লাগলো না জাহাঙ্গীরের ট্রাকিং ট্রান্সমিটারটি । সায়নার সামনের টেবিলে রেখে যাওয়া হয়েছে । রুমে লাইট মেরে আর কিছু না দেখে লাশটা পোষ্ট মর্টেমের জন্য পাঠাতে বললো ঈশান । অস্ত্র আনলোড করে জায়গা মত রেখে দিয়ে জাহাঙ্গীরের সাথে বেরিয়ে পরলো সে ।

– পুরো কষ্টটা বৃথা আমার । জাহাঙ্গীরের কন্ঠে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে । অবশ্য রাগ থাকাটাই স্বাভাবিক । এই ট্রাকিং ট্রান্সমিটারটি সেট করতে গিয়ে তাকে আহত হয়ে এক সপ্তাহ হসপিটালে থাকতে হয়েছে ।

– ভাবছি কখন ট্রাকিং ডিভাইসটি দেখতে পেয়েছে রায়হান ।

– সেটা কি এখন গুরুত্বপূর্ণ ?

– হু গুরুত্বপূর্ণ । কারন তাহলে বোঝা যাবে তাদের কতটা ট্রাক করতে পেরেছি আমরা । আমার অবশ্য মনে হচ্ছে গতকাল রাতে হয়তো তারা ট্রাকিং ডিভাইস দেখেছে । কারন কালকে থেকে আজকে পর্যন্ত এই জায়গা থেকে সিগন্যাল পেয়েছি । যাই হোক এখন আর কিছু করার নেই ।

– অন্য জায়গাগুলো আক্রমণ চালিয়ে দেখা যেতে পারে না ?

– উহুঁ, কোন লাভ নেই । হিসাব বলছে অন্তত চব্বিশ ঘন্টা আগে তারা ট্রান্সমিটার খুঁজে বের করেছে । এর মধ্যে তারা নিরাপদ অবস্থানে অবশ্যই চলে গিয়েছে । শুধু শুধু সময় আর পরিশ্রম হবে । তারপরও সাধারণ একটা ফোর্স পাঠিয়ে চেক করতে হবে । কথাটা বলে হাই তুললো ঈশান । বাড়িটা থেকে বের হতে যাবে এমন সময় নরম কিছুতে তার পা পরলো । হাতের লাইটের আলো ফেলে কাদা মাটি দেখলো ঈশান । এদিক ওদিক আলো ফেলতেই বাড়ির বাহিরে হালকা ভেজা মাটি দেখতে পারলো সে । বাড়ির পানির লাইনে হয়তো কোন সমস্যা হয়েছে । সেখানে থেকে পানি লিক করে এ অবস্থা ,ভাবছে ইশান । ভেজা মাটির উপর আলো ফেলতেই জুতোর ছাপ চোঁখে বাধলো তার । এ নিমিষেই সব ক্লিয়ার হয়ে গেল ঈশানের কাছে । গতকাল হয়তো এ পথে যাওয়ার সময় কোনভাবে রায়হান ভেজা মাটিতে পা দেয় । সম্ভবত পরবর্তী সময় হয়তো জুতো থেকে কাদামাটি পরিষ্কার করার সময় ট্রান্সমিটার দেখতে পারে । পরবর্তীতে ট্রান্সমিটার সায়নার কাছে রেখে দিয়ে চলে যায় । যাতে সায়নার লাশের ব্যবস্থা করতে পারি আমরা । ভালোই তো ! খুন করে লাশের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ।

– জাহাঙ্গীর, আমার চাচা শওকত হাসানের বাড়িতে কড়া নরজদারির ব্যবস্থা করো । কে কখন কোথায় যাচ্ছে, কে বাড়িতে আসছে সব রিপোর্ট সাথে সাথে আমি চাই । আর ছয়জনের একটা ফোর্স যে কোন সময়ের জন্য প্রস্তুত চাই । অল্পসময়ের নোটিশে যেন ফোর্স কে ব্যবহার করতে পারি । বুঝেছো ?

– জ্বি স্যার । আপনি কি আপনার চাচার উপর আক্রামন হওয়ার সন্দেহ করছেন ? কোন উত্তর না দিয়ে ঈশান গাড়িতে চেপে বসলো । জাহাঙ্গীর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ঈশানের দিকে । এই বার্ড নেষ্টে লোকটার ভাই আর ভাইয়ের স্ত্রী কে মেরেছে । এখন পরিবার বলতে একমাত্র তার চাচা শওকত হাসান । তো স্বাভাবিকভাবেই ঈশান তার চাচার নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে পারে । ঈশান কোন কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে চেপে বসলো ।

 

বারো.

শওকত হাসানের খুব মেজাজ খারাপ । সে ঈশান কে এতোবার বলেছে যে তারাতারি আদি আর সঙ্গীদের গ্রেফতার করতে । তারপর দেরী করছে ছেলেটা । আর ফলাফল হচ্ছে সব হাত ফস্কে গিয়েছে । না ধরতে পেরেছি আদি কে, না পারলো তার ডান হাত রায়হানকে । আরে বাবা এটা কি ছেলে খেলা নাকি ? অপেক্ষা করে ঠিক সময়ে হাতেনাতে ধরবো । ধরে গুলি করে দিলেই তো হয় । প্রমাণ করতে তো খুব কষ্ট হবেনা যে আদি অস্ত্র ব্যবসা করে । তবে এখন তার কিছু করার নেই । ঈশান ছিলো হাতেনাতে ধরে প্রমোশন নিবে এ অপেক্ষায় । শওকত হাসান যদি শুধু একবার ধরতে পারতো আদি কে ভাবছে সে । নগদে কয়েকটা বুলেট ঢুকিয়ে দিতো ওদের শরীরে । তবে যেহেতু এখন তার বয়স হয়েছে তাই চাইলেও সম্ভব না । কিছুক্ষণ নিজের রুমে পায়চারী করে ঘড়ির দিকে তাকালো শওকত হাসান । দশটা ছাব্বিশ বাজে ঘড়িতে । আজকে এক মিটিং আছে তার । বাহিরে থেকে কিছু লোক আসছে বিজনেস এর কাজে । অনেক হিসাব নিকাশ করে নিজের বাড়িতে তাদের আসতে বলেছে শওকত হাসান । তার বাড়ির দ্বিতীয় ফ্লোরের পুরোটাই বিজনেসের কাজে ব্যবহার করেন । যদিও এখানে খুব কমই মিটিং করেন । বড়সর কিছু না হলে সাধারণত তিনি এখানে কাউকে আসতে বলেন না । আজকেরটা তিনি একবার ভেবেছিলেন অন্য কোথায় বলবেন । কিন্তু কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে নিজের বাড়িতে মিটিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । কারন বাহিরের থেকে নিজের বাড়িতে নিরাপত্তা বেশি । দরজার কারো নক করার শব্দ শুনে আসতে বললেন শওকত হাসান । তার এসিস্ট্যান্ট আজাদ দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তার দিকে তাকিয়ে লোকের আসার কথা বললো । সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে শওকত হাসান ফোর্থ ফ্লোর থেকে দ্বিতীয় ফ্লোরে চলে আসলেন । নিজের অফিসরুমে প্রবেশ করতে চারজন লোককে বসে থাকতে দেখলেন । যদিও উল্টো হয়ে বসে থাকার কারনে তাদের কারোই চেহারা দেখা যাচ্ছে না । নিজের নির্ধারিত চেয়ারে বসে তাদের দিকে তাকাতেই মনে হলো কিছু একটা ঠিক নেই । যদিও খুব অস্বাভাবিক কিছু চোখে বাঁধছে না তার । তারপরও কেন যেন এ কথা মনে হচ্ছে । অবশ্য এরমধ্যে একটা কারন খুঁজে পেয়েছেন শওকত হাসান । তিনি এদের কাউকেই আগে দেখেনি কখনো তবে দুইজনের চেহারা পরিচিত মনে হচ্ছে । শুধু তাদের চুল আর দাড়ির কালার ভিন্ন । একজন লাল চুলের অন্যজনের চুল কালো হলেও চোখজোড়া সবুজ । চারজন লোকের মধ্যে একজন শুধু ল্যাপটপে দ্রুত কিছু কাজ করে যাচ্ছে । বাকি তিনজন তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ।

– হ্যালো হাসান সাহেব কেমন আছেন । পরিষ্কার বাংলায় লাল চুলের লোকটা বললো । মারাত্নক চমকে উঠলেন শওকত হাসান । বাংলায় কথা কিভাবে বলছে এই বিদেশী লোকটা । অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন শওকত হাসান । পাশে থেকে কেউ কথা বললো । যে লোকটা কিছুক্ষণ আগে দ্রুত ল্যাপটপ চাপাচাপি করছিলো সেই লোকটি । লোকটির নাম আবির । কম্পিউটার আর নেটওয়ার্ক সিস্টেমে এক্সপার্ট ।

– সিষ্টেম হ্যাকড । ক্যামেরা নিউট্রাল ।

– গুড । রায়হান, রনি তোমাদের কাজ শুরু করো । কথাটা বলার অপেক্ষায় ছিলো রায়হান আর রনি । দ্রুত তারা নিজের জায়গা থেকে উঠে শওকত হাসানের কাছে চলে আসলো । তবে তাদের হাত খালি না এ মূহুর্তে । দুজনের হাতে দুইটা সাত ইঞ্চি লম্বা আর্মি নাইফ দেখা যাচ্ছে । রনি এসে তার হাতের নাইফটা শওকত হাসানের কন্ঠনালীতে চেপে ধরলো । আর রায়হান তার ডেস্কের নিচে ইমার্জেন্সি সুইচের তার কেটে দিলো । সাথে সাথে শওকত হাসানের ড্রয়ার খুলে তার Colt M1911 নিয়ে নিলো । পুরো ঘটনা এত দ্রুত ঘটেছে যে শওকত হাসান অবাক হতেও পারলো না । তার খুব অল্প সময়ই লেগেছে বার্ড নেষ্টের লিডার আদিকে চিনতে । কিন্তু এর মধ্যে পুরো অবস্থা পাল্টে গিয়েছে । দ্রুত হিসাব কষতে শুরু করলো শওকত হাসান । ক্যামেরা যেহেতু বন্ধ করে দিয়েছে এরা তাহলে দ্রুতই চলে আসবে তার সিকিউরিটির লোক । তখন তাদের ইশারা দিলেই হবে । কিন্তু তাহলে যে আদি গুলি করবে তাকে এটা শওকত হাসান নিশ্চিত ।

– শওকত সাহেব আপনার সিকিউরিটি বেশ কড়া বলতে হয় । তবে যথেষ্ট না । অস্ত্র নিয়ে না আসতে পারলেন নাইফ নিয়ে আসতে পেরেছি । আর আমাদের জন্য এটাই যথেষ্ট তাই না ? আমাদের হাত একটা ছুরি থাকলেও সেটা পিস্তলের থেকে কম বিপদজনক না এটা আপনি জানেন । তো আমরা কি জন্য এসেছি আপনি নিশ্চয়ই ধারনা করতে পারছেন তাই না ?

– না পারছি না ।

– আমি আপনার বেডরুমের সেফ লকারে থাকা হার্ডডিস্ক চাই ।

– এ কথা ভুলে যাও । আমাকে খুন করলে তোমরা এখানে থেকে জীবিত বের হতে পারবে না । তো এখন নিজেরা কি ভাবে বেঁচে থাকবে সেটা ভাবো । কথাটা শোনার সাথে সাথে হাসির একটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো আদির মুখে ।

– আমরা নিশ্চয়ই এতটা বেকুব না যে যথেষ্ট প্রস্তুতি না নিয়ে এখানে প্রবেশ করবো তাই না ? বাসার খুব কাছেই আমার বারোজন লোক রাইফেল নিয়ে অপেক্ষা করছে । তারা নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে । তাদের সহযোগিতার জন্য দুইজন স্নাইপার রয়েছে খুব কাছাকাছি বিল্ডিং এ । তাছাড়া… আদির কথা শেষ করার আগেই শওকত হাসান কথা বললো,

– এগুলো যথেষ্ট কিছু না । বাড়ির গার্ড যথেষ্ট ট্রেনিং প্রাপ্ত । তারা যতই কিছু করুক না কেন । তোমরা জীবিত বের হতে পারবে না ।

– হয়তোবা । তবে আপনার নাতি নুঝাত কোথায় একবার ভেবেছেন কি ? কয়েক ঘন্টা আগে তো সে একা একা মার্কেটে গিয়েছে তাই না ?

– তাকে মেরে ফেললেও আমার বাস্তবিক কিছু আসে যায় না । তোমরা যেমন, আমিও তেমন নয় কি ? নিজের স্বার্থে যেকোনো মানুষকে বিসর্জন দিতে জানি ।

– সেটা আমি ভালোভাবেই জানি শওকত হাসান ওরফে নিশান । নিজের ভাই অর্থাৎ ঈশানের বাবা আর মা কে আপনি খুন করেছিলেন তাই নয়কি ? কি নিয়ে সমস্যা হয়েছিলো ? টাকা ভাগাভাগি নিয়ে ?

– না । ও কখনো এ কাজে ছিলো না । আমার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জেনে যায় আর সাথে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় । বাধ্য হয়েই মার্ডার করে এক্সিডেন্টের ঘটনা সাজাই ।

– আচ্ছা ভালো তো । নিজের ভাই কে যখন ছাড়েননি তখন নাতি কোন বিষয় ! যাই হোক আপনার লকার থেকে আমার প্রয়োজনীয় জিনিস বের করতে হলে আপনাকে জীবিত না রাখলেও চলবে । আমি আমার প্রয়োজন যেভাবে হোক মিটাবো । কথাটা বলার প্রায় সাথে সাথে হাতের মোবাইল কানে চেপে ধরলো ঈশান, তবে এখনো কথা বলছে সে শওকত হাসান নিশানের সাথে, আপনি কি হার্ডডিস্ক আমাদের দিবেন ?

– এ আশা তোমার মিটছে না ।

– আচ্ছা কি আর করার । আপনি এখন একটা নিষ্পাপ মেয়ের মৃত্যুর কারন হবেন । কানে চেপে ধরা মোবাইলে শুধু একবার বললো আদি, Kill her । কথাটা শোনার পর কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো শওকত হাসান । তার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না এরা অযথাই খুন করবে নুঝাত কে । তারপর দরকার পরলে তাকে মার্ডার করবে । তার লকার খুলতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও কোন লাভ নেই এখন আর । তিনি মরে গেলেও তার বডি ব্যবহার করে সিকিউরিটি ভাঙতে পারবে আদি । কিছুক্ষণের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো শওকত হাসান ।

– আদি নুঝাততে মার্ডার করার দরকার নেই । আমি হার্ডডিস্ক তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি । উপরে আমার রুমে চলো ।  এমন সময় রুমে গার্ড প্রবেশ করলো, শওকত হাসান কে প্রশ্ন করলো সবব ঠিক আছে কি না ? মাথা সায় দিয়ে শওকত হাসান বুঝালো সব ঠিক আছে । তাছাড়া রনি আর রায়হান নিজের পূর্বের অবস্থানে ফিরে গিয়েছিলো তাই কিছুই বুঝলো না সে । আদি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে শওকত হাসানের দিকে । মোবাইলে আসলে সে খুন করার কোন নির্দেশ দেয়নি । ব্লাফ দিয়েছিলো শওকত হাসানকে । তবে কাজে লেগে গিয়েছে । আদি জানে এই লোক নিজের ভাইকেও খুন করছে স্বার্থের জন্য । তাই নুঝাতের জীবন তার কাছে কোন দাম আছে এটা আশা করেনি আদি । তবে হয়তো শওকত হাসান বুঝতে পেরেছে আদি দরকার হলে খুন করবে তাকে । কারন তার লকারের অবস্থান তারা জানে । আর কোন কথা না বলে, শওকত হাসানের পিছন পিছন তারা চারজন আসলো । শওকত হাসান প্রথম তার দেয়ালে লাগনো পেইন্টিং সরিয়ে সেফ লকার দৃশ্যমান করলো । একে একে দুইহাতের ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে তারপর তার চোখটি রেটিনাল স্কানারের উপরে তিন সেকেন্ড ধরে রাখলো । ক্লিক একটা শব্দে সেফ লকারের দরজা খুলে যাওয়ার সাথে সাথে আদি লকারের সামনে থেকে শওকত হাসান কে সরিয়ে নিলো । কাউকে কিছু বলতে হচ্ছে না । সবাইকে বেশ ভালোভাবেই কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে । রনি হার্ডডিস্ক বের করে আবিরের কাছে দেওয়ার সাথে সাথেই আবির হার্ডডিস্ক টা ল্যাপটপের সাথে কানেক্ট করলো । ল্যপটপের মনিটরে দেখাচ্ছে ফাইল ট্রান্সফার হচ্ছে ।

 

দরজা কারো ধাক্কা দেওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে । দরজা লক থাকার কারনে বোঝা যাচ্ছে না কে এসেছে এখন । দরজার পাশে দ্রুত রায়হান নিরাপদ অবস্থানে চলে গেল । আদি একবার তাকালো ল্যাপটপের দিকে । ডাটা ট্রান্সফার Complete এক পলক দেখেই আদি বুঝলো । সাথে সাথে কানেকশনগুলো আরিফ ডিসকানেক্ট করে দিলো । কোন প্রমাণ থাকলো না ডাটা ট্রান্সফার করার কারণ সব ডাটা মূলত হাইস্পিডে তাদের নিজেদের সার্ভারে পাঠানো হয়ে গিয়েছে । যেটা এখন তাদের কেউ ছাড়া access নিতে পারবে না । কয়েক সেকেন্ডের বিরতিতে প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভের কারনে দরজা উড়ে গেল । আদি ঘুরে তাকাতেই অবাক না হয়ে পারলো না । ঈশান হাতে অস্ত্র নিয়ে রুমে প্রবেশ করেছে । সাথে রাইফেল হাতে আরো কয়েকজন দেখা যাচ্ছে । আদির বুঝতে অসুবিধা হচ্ছেনা ঈশান এ বাড়ির উপর নরজদারি করছিলো । নাহলে তারা এখানে এসেছে ২০ মিনিট হয়নি এর মাঝে কিভাবে ঈশান সশস্ত্র ফোর্স নিয়ে চলে আসে ? আদি কে লক্ষ করে ঈশান গুলি করলো । আদি প্রস্তুত ছিলো এ ঘটনার জন্য । সে ঈশানকে দেখে সাথে সাথেই বুঝতে পেরেছিলো তাকে জীবিত ধরার কোন ইচ্ছেই নেই ঈশানের । আদি শওকত হাসানকে শরীর দিয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করলো । গুলিটা শওকত হাসানের বাম চোখের মধ্যে দিয়ে ঢুকে যাওয়ার সাথে সাথে কুখ্যাত সন্ত্রাসী শওকত হাসান ওরফে নিশান মৃত্যু হলো । দরজার আড়ালে দাড়িয়ে থাকা রায়হান নিজের কাজ বুঝে নিতে দেরী করলো না । মূলত তার এখানে দাড়ানোর কারন ছিলো যদি শওকত হাসানের গার্ড কোন সমস্যা করে তাহলে কিছুক্ষণ যেন প্রতিরোধ করতে পারে । শওকত হাসানের ডেস্কে পাওয়া Colt M1911 দিয়ে ঈশানদের লক্ষ করে গুলি করতে শুরু করলো সে । প্রথম গুলি ঈশানের কাঁধে বিধলো । কাধে গুলি খাওয়ার পরও ঈশান একবার চেষ্টা করলো আদি কে লক্ষ করে গুলি করতে । তবে এবার কোন লাভ হলো না ঈশানের । রায়হানের গুলির ধাক্কায় সে নিজের ভারসাম্য হারিয়েছে । ফলে গুলি লক্ষ ভ্রষ্ট হয়ে সোজা আদির হাতের হার্ডডিস্কে গিয়ে লাগলো । আদি জানে তাদের আর কোন উপায় নেই । গ্রেফতার হতে এখন তারা বাধ্য । আদি চুপচাপ হাত উপরে তুলে দিলো মাথার উপর । সাথে সাথে অন্যদের আত্নসমর্পণ করতে বললো । একমাত্র আত্নসমর্পণ করলে এখানে থেকে জীবিত বের হওয়া যাবে ।

 

তের.

আদি আর ঈশান পরস্পরের মুখোমুখি বসে রয়েছে । ঈশানের কাধে ব্যান্ডেজ দেখা যাচ্ছে । রায়হানের গুলি তার কাধে মোটামুটি বেশ ভালো ক্ষতি করে দিয়েছে । অন্তত কয়েক মাস এ ক্ষতের যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে । তবে এটা নিয়ে ঈশানের কোন আপত্তি নেই । কারন আদি অন্তত ধরা পরেছে । তবে একটা ব্যাপার নিয়ে এখনো ঈশান আফসোস করছে । যদি একবার পুরো ঘটনা নতুনভাবে ঘটানো যেত । তাহলে অন্তত আদিকে সেখানেই গুলি করে মেরে ফেলতো ঈশান । যেহেতু এরকম হওয়ার আর কোন সুযোগ নেই । তাই আপাতত গ্রেফতার করেই ঈশানের খুশি থাকতে হচ্ছে । ইশান নিজে সিগারেট খায় না । তবে আদির জন্য এক প্যাকেট সিগারেট আনতে বললো । সিগারেট আনার সাথে সাথে সেটা আদির দিকে পাস করলো । আদি কোন কথা না বলে সিগারেট জ্বালিয়ে ঈশানের উদ্যেশ্যে কথা বলতে শুরু করলো,

– ঈশান সাহেব কেমন আছেন ?

– আমার তো এ মূহুর্তে ভালো থাকা উচিত তাই না ? শত হলেও আপনাকে হাতেনাতে ধরতে পেরেছি । তার উপর সায়নার মার্ডার কেস আপনাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য যথেষ্ট ।

– উহুঁ সেটা যথেষ্ট না আপনি জানেন । আসলে কোন প্রমাণ আপনার কাছে নেই যেটা দিয়ে প্রমাণ করতে পারবেন আমি সায়নাকে মার্ডার করেছি । যাই হোক হার্ডডিস্ক থেকে কোন তথ্য জানতে পেরেছেন কি ?

– না গুলির আঘাতে হার্ডডিস্ক পুরো বাতিল । কি তথ্য ছিলো সেখানে ?

– নিশানদের সন্ত্রাসী সংগঠন সম্পর্কে সব তথ্য ।

– আপনি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করতে বলছেন না আমার চাচা শওকত হাসানই কুখ্যাত সন্ত্রাসী, নারী পাচারকারী নিশান ।

– আপনি নিজেও সেটা ভালোভাবেই জানেন । তাছাড়া আপনি ইচ্ছে করেই হার্ডডিস্কে গুলি করেছেন । কারন আপনি জানেন সেখানে কি রয়েছে । আর জানবেন না কেন ? আপনি নিজেও সংগঠনের অন্যতম একজন । বলা যায় নিশানের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী ।

– আপনি কিছুই প্রমাণ করতে পারবেন না ।

– আসলেই কি তাই ? আমার ধারনা সেফ লকার আপনার ফিঙ্গার প্রিন্ট আর রেটিনা স্কান দিয়ে খোলা যাবে । এটা কি প্রমানের জন্য যথেষ্ট না আপনি তার সাথে সম্পৃক্ত ?

– যদি যায় তাহলেও কোন লাভ নেই । কারন আপনার কাছে কোন প্রমাণ নেই আমার চাচাই নিশান ।

– যাক আপনি অন্তত স্বিকার করলেন যে আপনি ও লকার খুলতে পারবেন । যাই হোক প্রমাণ সময়ের সাথেই হয়ে যাবে । আচ্ছা আমি তো নাহিদ কে বাঁচানোর জন্য আপনাকে ফোন করিনি । তাহলে ঘটনার পিছনে কে ছিলো ? আপনার চাচা তো অবশ্যই । সাথে আপনি নিজেও তাই না ? তো নিজের আপন ভাই আর তার স্ত্রী কে কেন খুন করেছেন ? যাতে আপনাকে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ বিশ্বাস করে আর বার্ড নেষ্টের কেসে নিযুক্ত করে ? তবে আমার ভিন্ন মনে হচ্ছে । শুধু এ কারনে তাদের খুন করেননি আপনি । হয়তোবা তারা আপনার কার্যকালাপ সম্পর্ক জেনে যায় যে কারনে তাদের সুযোগ পেয়ে সরিয়ে দিয়েছেন । সেম কাজটা আপনার চাচা করেছিলো তার আপন ভাইকে খুন করে । অর্থাৎ আপনার বাবা মা কে মার্ডার করে ।

– আমার বাবা মা সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছে ।

– আসলেই কি তাই ? আচ্ছা নিজের ভাই কে খুন করার বুদ্ধিটা কার ছিলো ? আমি সিউর আপনার চাচার । কারন আপনি সব নির্দেশনা আপনার চাচার কাছে থেকেই নিতেন তাই নয় কি ?

– আপনি কিছুই প্রমাণ করতে পারবেন না । শুধু শুধু বাজে না বকে । নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন ।

– আসলে আমি এমনিতেই বলছিলাম । আর আমার কিছুই হতে যাচ্ছে না । আমি কয়েক ঘন্টার মধ্যে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছি । তারপর নিজের পরিবারের কাছে চলে যাবো । অনেকদিন তাদের ছেড়ে রয়েছি । আর ভালো লাগে না ।

– আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে ? দিবাস্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন দেখছি ।

– উহুঁ, দিবাস্বপ্ন না । বাস্তবতা এটাই । কেন ছাড়বেন আপনি আমাকে নিশ্চয়ই ভাবছেন । আচ্ছা আপনাকে একটা গল্প বলি তাহলে । তবে তার আগে আমার দুইহাতে লাগানো হ্যান্ডকাফ খোলার ব্যবস্থা করেন তো । বিরক্ত লাগছে এই জিনিসটাকে । আপনাদের সিকিউরিটি যথেষ্ট আছে । আমার পালানো কোনভাবেই সম্ভব না । তাই নয় কি ? একরাশ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে কথাটা বললো আদি । ঈশান কিছুক্ষণ ভেবে হ্যান্ডকাফ খুলে দিতে বললো । হাতের মাংসপেশী কয়েকবার ম্যাসেজ করে আদি তার দৃষ্টি ঈশানের দিকে ফেরলো । ঈশান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আদির দিকে । অপেক্ষা করছে হয়তো আদির গল্প শোনার । কথা বলতে আবার শুরু করলো আদি, কোথায় থেকে শুরু করা যায় বলেন তো ? একেবারে শুরু থেকেই বলি ? তখন মাত্র আমাকে আলফা স্পেশাল এজেন্সির ইনচার্জ করা হয়েছে । দেশের সন্ত্রাসী কার্যকালাপ বন্ধ করা আর সিক্রেট মিশন নিয়ে আমাদের কাজ ছিলো । আমি লিডার হিসাবে কখনোই খারাপ ছিলাম না । বেশ ভালোভাবেই চলছিলো সব । একসময় আমাদের হাতে নিশানের সংগঠনের কেস এসে পরলো । কাজ চলছিলো । প্রায় তাদের ধরার সব প্রস্তুতি নেওয়া শেষ । একদল হাইলি ট্রেইন এজেন্ট পাঠালাম তাদের বিরুদ্ধে । তবে তথ্য কোনভাবে ফাঁস হয়েছিলো । তখনও বুঝতে পারিনি সায়নাই কাজটা করেছে । এই কেসের প্রথম মিশনেই নয়জনকে জীবন দিতে হলো । আর কয়েকবার মিশনে এজেন্ট পাঠানোর পর মোট ষোলজন এজেন্ট হারিয়েছি । বুঝতে অসুবিধা হলো না নিজেদের মধ্যেই তাদের গুপ্তচর রয়েছে । নতুন টিম গড়ে তুললাম তাদের বিরুদ্ধে, তাদের ধ্বংস করার জন্য । পুরো প্লান পরিবর্তন করে নিজেদের আইনের বাহিরে নিয়ে আসলাম । মিথ্যা স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির কেস সাজিয়ে জেল খাটলাম কয়েকজন আমরা । এজেন্সি বন্ধ করে দেওয়া হলো । যেটা আপনি আর আপনার চাচা চেয়েছিলেন । আপনার নিশ্চিতভাবে যখন নিজেদের কাজ শেষ করেছেন ভাবলেন । ঠিক তখনই আমি সন্ত্রাসী সংগঠন গড়ে তুললাম আমার বিশ্বস্ত কিছু এজেন্ট নিয়ে গড়ে তোলা স্পেশাল আলফা এজেন্সির সদস্যদের নিয় । এই এজেন্সির নাম দেওয়া হলো বার্ড নেষ্ট । অর্থাৎ এটা সন্ত্রাসী সংগঠন না । এটা স্পেশাল ফোর্সের নাম । যাই হোক অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমরা নিজেদের গড়ে তুললাম আপনাদের বিপক্ষ হিসাবে । আর এদিকে অয়ন তদন্ত চালাচ্ছিলো আমরা জানতাম । যখন খবর পেয়েছি তার কাছে নিশানের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য আছে তখন দখল করতে চাইলাম ফাইলটা । এদিকে আপনি সায়নার সহায়তায় চেষ্টা করেছিলেন ফাইলটা গায়েব করার । যেটা অয়ন জেনে যায় । আর সায়নাকে আক্রমণ করে । ফলস্বরূপ অয়ন মার্ডার হয় । তবে আমাদের ভাগ্য এবার ভালো বলতেই হয় । ঠিক সময়ে উপস্থিত হয়েছিলাম অয়নের কাছে থেকে ফাইল উদ্ধার করতে । সায়নাও ধরা পড়লো আর আপনার আসল পরিচয় আমি জানতে পারলাম । শেষ কাজ হিসাবে আক্রমণ করলাম আপনার চাচার বাসায় । যদিও খুব রিস্ক নিয়ে কাজ করা লেগেছে । কারন আমরা শত হলেও তখন সন্ত্রাসী সংগঠন । আর বিদেশে মানুষ কিডন্যাপ করে তাদের জায়গায় নিজেদের ব্যবহার করে বাসায় প্রবেশ করেছি । এছাড়া কোন উপায় অবশ্য ছিলো না । যে ভয়ানক সিকিউরিটি আপনার চাচার বাসায় ।  পিপড়া ও ভয় পাবে সেখানে প্রবেশ করতে । হার্ডডিস্ক যখন হাতে তখন আপনি আক্রমণ করলেন । হার্ডডিস্ক নষ্ট করে দিলেন প্রথম সুযোগে । তবে আপনি কি জানেন আমাদের কাছে সব ডাটা রয়েছে । কিছুই হয়নি ক্ষতি আপনার হার্ডডিস্ক নষ্ট করা থেকে । আপনার ভাগ্য খারাপ বলতেই হয় । যাইহোক এখন নিজে কিভাবে বাঁচবেন সেটা ভাবেন । কথাটা শুনে কিছুক্ষণ ঈশান চুপ করে থাকলো । তারপর কথা বলতে শুরু করলো,

– মেনে নিলাম আপনি সব সত্য বলছেন । যদিও আমি আমার ভাই আর তার স্ত্রী কে মার্ডার করে থাকি আপনি সেটা প্রমান করতে পারবেন না । আমি নিশানের দলের লোক হলেও নিশ্চয়ই এতটা বোকা নই কোন প্রমাণ রাখবো আমার কাজের ? আর যত তথ্যই থাকুক আপনার কাছেই আমি নিশ্চয়ই এতটা বোকা নয় যে নিজের সম্পর্কে কোন তথ্য সেখানে রাখবো । যেহেতু আমার বিরুদ্ধে কোন শক্তিশালী প্রমান নেই তাই আমি পুরোপুরি মুক্ত । আপনি কিছুই করতে পারবেন না আদি সাহেব । আমি গায়ে বাতাস লাগিয়ে মুক্ত পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবো আগের মতই । এখন আপনি আইনের লোক । আপনি আইনের বাহিরে গিয়ে কিছুই করতে পারবেন না । যাই হোক আপনাকে আমার আর কিছুই বলার নেই । কারন আপনার পদ বলছে আপনি আমার থেকে অনেক উপরের কর্মকর্তা । আচ্ছা যাই হোক ভালো থাকবেন । কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো ঈশান । হেটে বেরিয়ে গেল সে রুম থেকে । আদি সিগারেটের প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে তাকিয়ে রইলো ঈশানের চলে যাওয়া পথের দিকে ।

 

চৌদ্দ.

আদি নিজের পরিবারের সাথে বসে রয়েছে । তাকিয়ে নিজের মেয়ে অদ্বিতীয়া আর সমৃদ্ধি কে দেখছে । আদি অবাক হয়ে ভাবতে এই ফুটফুটে বাচ্চা দুটো আসলেই তার! কিভাবে সে এতদিন এদের ছেড়ে ছিলো! মোবাইলের রিংটোনের শব্দে আদির ধ্যান ভাঙলো । হাতে মোবাইলটি নিয়ে আদি দেখলো রায়হানের কল । আদি কলটা রিসিভ করে কানে চেপে ধরলো মোবাইল,

– হা রায়হান বলো ।

– আপনার কথাই ঠিক মনে হচ্ছে স্যার । ঈশান সম্ভবত পালাচ্ছে ।

– তুমি জানো তোমার কি করতে হবে । তাই না ?

– জ্বি স্যার ।

– গুড । নিখুঁত কাজ আমি চাই ।

– ওকে বলে কলটা কেটে দিয়ে স্নাইপার হাতে তুলে নিলো রায়হান । স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ঈশান কে । ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে উঠবে সম্ভবত কিছুক্ষণের মধ্যেই । রায়হানের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে । মানুষ খুন করতে রায়হানের কখনো ভালো না লাগলেও ঈশান কে মার্ডার করতে সে আনন্দ পাবে এটা রায়হান নিশ্চিত । মুখে হাসিটা ধরে রেখেই স্নাইপারের ট্রিগারে চাপ বাড়াতে লাগলো রায়হান ।

 

 

(সমাপ্ত)