ইকারাসের ডানা

মাসুদ ফেরদৌস

৮ম ব্যাচ, এভিউনিকস

 

প্রাচীন গ্রীসের রাজধানী এথেন্স।

এ নগরীতেই বাস করতেন প্রখ্যাত একজন কারিগর , ডিডেলাস। বিভিন্ন অদ্ভুত জিনিস নির্মাণ করে নগরেরসবাইকে সবসময় বিস্মিত করে রাখতেন তিনি। রাজপরিবারের সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ায় এবং অদ্ভুত অদ্ভুদ সব আবিষ্কারের কারণে নগরবাসীও তাকে বিশেষ সম্মানের চোখেই দেখতো। কিন্তু নগরবাসী সবার পছন্দের এ মানুষটিই একদিন ক্ষমার অযোগ্য একটি ঘৃণ্য অপরাধ করে ফেললেন।

ডিডেলাসের একটি ভাগিনা ছিলো, নাম পার্ডিক্স। পার্ডিক্স তার মামা ডিডেলাস কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করতো। কিন্তু আবিষ্কারের দিক দিয়ে নিজ মামাকেও সে ছাড়িয়ে যায়। চার বছর বয়সেই পার্ডিক্স মাছের চোয়ালের অনুকরণে করাত, বাটালি, চাকা, কম্পাস ইত্যাদি আবিষ্কার করে সবার তাক লাগিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে নগরবাসী পার্ডিক্সকে সমাদর করতে লাগলো। পার্ডিক্সের মামা ডিডেলাসের তা সহ্য হলো না। তিনি পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে ফেলে পার্ডিক্সকে হত্যা করে ফেললেন!

হত্যার অভিযোগ মাথায় নিয়ে ডিডেলাস দেশ থেকে নির্বাসিত হলেন। তিনি আশ্রয় নিলেন ক্রিটের রাজা মাইনোসের দরবারে। কিন্তু সেখানেও রাজার বিরাগভাজন হয়ে পুত্র ইকারাসসহ একটি দ্বিপে কারারুদ্ধ হলেন। কিন্তু বন্দীজীবন ডিডেলাসের ভালো লাগলো না।  ডিডেলাস মুক্তির পথ খুঁজতে লাগলেন। হঠাৎ তার মাথায় বৃদ্ধি এলো। তিনি পাখির পালক আর মোম জোগাড় করে তৈরি করলেন উড়তে সক্ষম এমন ডানা। সেই ডানা দিয়েই পুত্র ইকারাসকে নিয়ে আকাশে উড়াল দিলেন। আকাশে উড়েই পুত্রকে তিনি প্রথম যে কথাটি বললেন তা হলো, সে যেন উড়তে উড়তে বেশি উঁচুতে উঠে না যায়। কারণ এতে মোম গলে সে নিচে পড়ে যাবে। কিন্তু কৌতূহলী ইকারাস শেষ পর্যন্ত সেই ভুলটিই করলো। উড়তে উড়তে অনেক উঁচুতে সে উঠে পড়ে। সূর্যের তাপে মোম গলে তার ডানা দুটো নষ্ট হয়ে যায়। ইকারাস হারিয়ে যায় সমুদ্রের অতল জলরাশিতে। হতভম্ব পিতা বিষণ্ণ দৃষ্টিতে পুত্রের মৃত্যু-দৃশ্য দেখলেন। কিন্তু তার করার কিছুই ছিলো না। পুত্রশোকের গভীর দুঃখবোধ বুকে নিয়েই আবার তিনি আকাশে। হারিয়ে গেলেন দিগন্তের ওপারে। দিগন্তে তখন রক্তলাল সূর্য তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

10

ছবি- ইকারাসের মর্মান্তিক পরনতি

নিঃসন্দেহে রূপকথার গল্প এটি। ইকারাসের মর্মান্তিক পরিণতির এ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় গ্রীক মিথে। কিন্তু প্রাচীন এ রুপকথাটিই কি প্রমাণ করে না বহু পূর্ব থেকে আকাশে উড়ার মানুষের এ বাসনাকে?

বহু প্রাচীন কালেই পাখির আকাশে ওড়া দেখে মানুষ আকাশে উড়তে চেয়েছে। পাখির একজোড়া ডানা আছে যা মানুষের নেই। তাই স্বাভাবিক পদ্ধতিতে মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়নি আকাশে ওড়া। কিন্তু তাই বলে মানুষ থেমে থাকেনি। বিভিন্ন পদ্ধতিতে চেষ্টা করে গেছে আকাশে ওড়ার। এসব চেষ্টারই চূড়ান্ত রূপ বর্তমান যুগের আধুনিক এয়ারক্রাফটগুলো।

এভিয়েশনের ইতিহাস বলতে গেলে শুরুতেই বলতে হবে চীনাদের কথা। খ্রিষ্টপূর্ব ১০০ সালে চীনের মানুষরা ঘুড়ি তৈরি করতে ও উড়াতে পারতো। প্রায় ২০০০ বছর আগে চীনাদের ঘুড়ির হাত ধরেই শুরু হয় এভিয়েশনের ( Aviation; ল্যাটিন Avis থেকে Aviation শব্দটি এসেছে। Avis শব্দের অর্থ পাখি ) ইতিহাস। চীনাদের তৈরি এসব ঘুড়িকেই মানবসৃষ্ট প্রথম আকাশযানের মর্যাদা দেয়া হয়। পরবর্তীতে চীনদেশ থেকে ঘুড়ি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরে। চীনের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় বিনোদনের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসব ঘুড়ি ব্যবহৃত হতো, যেমন – দূরত্ব পরিমাপ, বাতাস নিয়ে পরীক্ষা, সিগনাল ও তথ্য আদান প্রদান ইত্যাদি।

11

ছবি- প্রাচীন চীনের ঘুড়ি

এছাড়া চীন ও জাপানের প্রাচীন ইতিহাসে মনুষ্যবাহী ঘুড়ির কথা জানা যায়। এসব ঘুড়ি মিলিটারি ও সিভিল উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতো। এমনকি অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার কাজেও নাকি এসব ঘুড়ি ব্যবহার করা হত! চীনারা সেসময় এটাও বুঝতে পারে যে গরম বাতাস ওপরে উঠে যায়। বাতাসের এ ধর্ম ব্যবহার করে তারা তৈরি করে Hot Air Ballon যা Sky Lantern নামে বেশি পরিচিতি পায়। তখন তারা এগুলো বিভিন্ন উৎসবে ব্যবহার করতো যার প্রভাব আজও চীনের বিভিন্ন উৎসব আর অনুষ্ঠানে দেখা যায়।

12

ছবি- চীনের ঘুড়ি উৎসব

এরপরে এভিয়েশনে উল্লেখযোগ্য কাজ যিনি করেন তিনি হচ্ছেন মুসলিম শাসিত স্পেনের আব্বাস ইবনে ফিরনাস। নবম শতাব্দীতে আব্বাস ইবনে ফিরনাস স্পেনের কর্ডোভাতে একটি ইঞ্জিনবিহীন গ্লাইডারের ডিজাইন করে তা বানাতেসক্ষম হয়েছিলেন । তিনি এ কাজে পাখির পালক দ্বারা আবৃত ডানা ব্যবহারকরেছিলেন । তার এ ওড়ার এ প্রচেষ্টা সফল হয়েছিলো, এবং তিনি কিছুক্ষন ওড়তেসক্ষম হন ।তবে দূর্ঘটনাবশত ল্যান্ডিং-এর সময় তিনি ক্র্যাশ করেন। পরবর্তীতেতিনি এ সেক্টরে কাজের উৎসাহ হারিয়ে অন্যান্য আবিষ্কারের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পরেন ।

13

ছবি- আব্বাস ইবনে ফিরনাস

এর পরের উল্লেখযোগ্য কাজটি করেন বিখ্যাত চিত্রকর লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি। ১৪৮৬- ১৪৯০ সালের ভেতর কোন এক সময় ভিঞ্চি একটি আকাশযানের ছবি আঁকতে সক্ষম হন। দেখতে অনেকটা পাখির মত এ যন্ত্রটির নাম দেয়া হয় Ornithopers। পাখির মত করে ডানা ঝাপটে ওড়ার মত করে এর ডিজাইন করা হয়। তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি পাখির ওড়া দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

14

ছবি- দ্যা ভিঞ্চির ডিজাইন

 

তবে দুঃখের বিষয় এই যে, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির সেই আকাশযানটিকে তখন বাস্তব রূপ দেয়া সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি এর অন্যতম একটি কারণ ছিল ভিঞ্চির সেই ডিজাইনটির বাস্তব বিজ্ঞানসম্মত কোনো ভিত্তি ছিল না।

এর পরে যে দুই ব্যাক্তির কথা না বললে এভিয়েশনের ইতিহাসের প্রতি অত্যাচারই হয়ে যায়, তারা হলেন উসমানী সাম্রাজ্যের “সেলেবী ভ্রাতৃদ্বয়”। আব্বাস ইবনে ফিরনাসের ব্যর্থতার পর, ১৬০০ সালের দিকে হেজারাফেন আহমেদসেলেবী (Hezarafen Ahmed Celebi) নামের আরেকজন আবিষ্কারক আকাশে ওড়ার চেষ্টা চালান এবং সফলতা অর্জন করেন । হেজারাফেন আহমেদ সেলেবী বিভিন্নজ্ঞানে অভিজ্ঞ একজন মানুষ ছিলেন । উসমানী খিলাফতের স্বর্ণযুগে তিনিইস্তাম্বুলে বসবাস করতেন । ১৬৩০ সালে তিনি নিজের শরীরের সাথে যুক্ত করতেসক্ষম এমন একজোড়া পাখার ডিজাইন করেন ।

15

ছবি- হেজারাফেন আহমেদ সেলেবী

উসমানী ইতিহাসবিদ এবং পরিব্রাজক এভলিয়া সেলেবীর তথ্যানুসারে, হেজারাফেনআহমেদ সেলেবী তার পাখাসহ ইস্তাম্বুলের গালাটা টাওয়ার থেকে লাফ দেন এবংবসফরাস অতিক্রম করে সোজা ডোগানসিলার স্কয়ারে (Dogancilar Square) অবতরনকরেন । তার যাত্রাপথ প্রায় দুই মাইলের মত ছিলো । উচু টাওয়ার এবং টাওয়ারটিপাহাড়ের ওপর হওয়ার কারনে তিনি এ দূরত্ব অতিক্রম করার মত উচ্চতা অর্জন করতেপেরেছিলেন, যা তাকে সফলভাবে বসফরাস অতিক্রম করতে সহায়তা করেছিলো ।
বসফরাস প্রনালীটি ইস্তাম্বুলকে দুটি ভাগে ভাগ করেছে । এর একভাগ পরেছেএশিয়া মহাদেশে, অন্যভাগ ইউরোপে । তাই হেজারাফেন আহমেদ সেলেবীকে পৃথিবীরইতিহাসের সর্বপ্রথম আন্তঃমহাদেশীয় উড্ডয়নে সক্ষম মানব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াহয়েছে । হেজারাফেন আহমেদ সেলেবীর এ গৌরবময় কাজের জন্য সুলতান চতুর্থ মুরাদ তাকে স্বর্নমুদ্রা দ্বারা পুরস্কৃত করেন ।

16

ছবি- হেজারাফেন আহমেদ সেলেবীর আন্তঃমহাদেশীয় উড্ডয়ন

 

এরপরের উল্লেখযোগ্য ব্যাক্তিটি হলেন লাগারী হাসান সেলেবী। লাগারী হাসান সেলেবী এবং হেজারাফেন আহমেদ সেলেবী দুই ভাই ছিলেন।  সম্ভবত নিজ ভাই হেজারাফেন আহমেদ সেলেবীরদ্বারাঅনুপ্রানিত হন তারছোটভাই লাগারী হাসান সেলেবী (Lagari Hasan Celebi)। তিনিও পৃথিবীরঅভিকর্ষকে পাশ কাটিয়ে আকাশে ওড়ার চেষ্টা চালাতে লাগলেন । ১৬৩৩ সালে তিনিমানুষকে বহনযোগ্য একটি রকেট ইঞ্জিনের ডিজাইন করেন । তার তৈরিকৃত এ রকেটইঞ্জিনটিকে শক্তির যোগান দিতো৩০০ পাউন্ডেরও বেশি গানপাউডার । এভলিয়াসেলেবীর (Evliya Celebi)-র তথ্যানুসারে, সুলতান মাহমুদের কন্যার জন্মউপলক্ষে বসফরাস প্রনালীর তীরে তিনি তার রকেটটির পরীক্ষা চালান । স্থানটিসুলতানের বাসভবন তোপকাপী প্যালেসের (Topkapi Palace) নিকটবর্তী ছিলো ।17

ছবি- লাগারী আহমেদ সেলেবীর রকেট নিয়ে পরীক্ষা

রকেটটি ব্যাবহার করে তিনি প্রায় ৩০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত উঠতে সক্ষমহন । জ্বালানী শেষ হয়ে গেলে তিনি তার নিজের ডিজাইন করা পাখা ব্যাবহার করেগ্লাইড করেন এবং বসফরাস প্রনালীতে অবতরন করেন । পরে সাঁতার কেটে তীরে পৌছান। তার ভাইয়ের মতই নিজের কৃতিত্বপূর্ন অর্জনের জন্য সুলতান তাকেস্বর্নমুদ্রা দ্বারা পুরস্কৃত করেন এবং তিনি উসমানী সেনাবাহিনীরএকটি অশ্বারোহী ইউনিটেরঅফিসার হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন ।

আকাশে ওড়ার এ অদম্য প্রচেষ্টাকে এরপর এগিয়ে নিয়ে যানRoizerও Arlandesনামক দুই ব্যক্তি। তারা বেলুনের সাহায্যে আকাশে উড়ে প্যারিস থেকে ৫ মাইল দূরে অবতরণ করতে সক্ষম হন। এটি ২১ নভেম্বর, ১৭৮৩ সালের ঘটনা। ১৭৯৯ সালে George Cayleyনামক একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম আধুনিক এয়ারক্রাফটের ডিজাইন করেন। এতে লিফট তৈরির জন্য ফিক্সড উইং, প্রপালশনের জন্য প্যাডেল আর স্ট্যাবিলিটির জন্য হরিজন্টাল ও ভার্টিকাল স্ট্যাবিলাইজার সংযোজন করেন। ১৮৫৩ সালে তিনি নির্মাণ করেন মনুষ্যবাহী গ্লাইডার। তিনি নিজেই এতে চড়ে এটি পরীক্ষা করেন। গ্লাইডারটি দেখতে অনেকটা Triplaneএর মত ছিলো। স্যার George Cayleyকে ১৮৪৬ সালে “Father of Aeroplane” উপাধি দেয়া হয়।

23

 

ছবি- জর্জ কেলী, ফাদার অফ এরোপ্লেন

 

১৮৬৬ সালে Aeronautical Society of Great Britain প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার দুই বছর পরই তারা একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। আকাশে ওড়ার জন্য মানুষ আরো ব্যাকুল হতে থাকে। ১৮৯১ সালের দিকে Otto Lilienthal নামক একজন Aeronautical Engineer গ্লাইডারের সাহায্যে বিভিন্ন আবহাওয়ায় , বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উচ্চতা থেকে ঝাপ দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। প্রায় ২০০০ বার সফল গ্লাইডিং-এর পর তিনি তার সংগৃহীত তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। এসব তথ্য পরবর্তীতে মানুষের ওড়ার স্বপ্নকে সহজ করে দিয়েছিলো।

19

ছবি- অটো লিলিয়েন্থাল

 

এর ভেতরেই ১৮৮৪ সালে ফ্রেঞ্চ আর্মি উন্নত ধরনের এয়ারশিপ তৈরি করতে সক্ষম হয়। এটিকে ইলেকট্রিক্যালি নিয়ন্ত্রণ করা যেতো।

20

ছবি- ফ্রেঞ্চ আর্মির এয়ারশিপ

এভিয়েশনের ইতিহাসে এর পরেই আসে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের কথা। উইলবার রাইট ও অরভিল রাইট নামের এই দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উচ্চতায় বসে পাখির ওড়া পর্যবেক্ষণ করেন। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে অক্লান্ত পরিশ্রমে নির্মাণ করেন একটি পাওয়ার্ড এয়ারক্রাফট । সম্পূর্ণ নিজস্ব ক্ষমতা ব্যবহার করে তাদের এয়ারক্রাফটটি খানিকটা উঁচুতে উঠে কিছু দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। ১২ সেকেন্ডের এ ফ্লাইটে তারা মাত্র ২৬০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটিই প্রথম পাওয়ার অপারেটেড এয়ারক্রাফট। দিনটি ছিলো ১৭ ডিসেম্বর, ১৯০৩ সালের কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের এক সকাল। এ ঘটনার পরপরই এভিয়েশন একটি নতুন যুগে প্রবেশ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে রাইট ব্রাদার্স-রা কিন্তু নিজেরাও উড়োজাহাজ নিয়ে এতোটা আশাবাদী ছিলেন না। ১৯০৫ সালে উইলবার রাইটের একটি উক্তি থেকে এটা বেশ স্পষ্টই বোঝা যায়। তিনি বলেন,

“আমি মনে করি না যে উড়োজাহাজ ভবিষ্যতে বিশ্বের স্থল যোগাযোগের বিকল্প হবে। আমি বিশ্বাস করি এটা শুধু বিশেষ উদ্দেশ্যে সীমিত থাকবে । এটা যুদ্ধেব্যবহার হবে । এটা ভবিষ্যতে ডাক যোগাযোগের কাজেও ব্যবহার হতে পারে ।”

উইলভার রাইটের ভবিষ্যতবানীটি আংশিক সফল হয়েছে । আজ যে কোনো সামরিক বাহিনীরজন্য যুদ্ধবিমান সত্যিই অপরিহার্য বিষয় । তবে মজার বিষয় , উইলভার রাইটেরভবিষ্যতবানীটিকেবুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আজ প্রতি বছর ৩০০ কোটি যাত্রী প্রায় ১০০ কোটি মাইল আকাশপথ অতিক্রম করছে ! কারন এর পর থেকে একে একে নতুন ডিজাইন আসতে লাগলো আর তৈরি হতে থাকলো আধুনিক সব এয়ারক্রাফট।

21

ছবি- রাইট ব্রাদার্সের সেই ঐতিহাসিক ফ্লাইটটি

প্রথম দিকের এয়ারক্রাফটগুলো শুধুমাত্র সামরিক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হত। পরবর্তীতে তা যাত্রী পরিবহন, মালামাল বহন সহ অন্যান্য সার্ভিসের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কি হারে যুদ্ধবিমান তৈরি হয়েছে তা ছোট একটি পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যাবে। এ বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে জার্মানীর যুদ্ধবিমান ছিলো ১৮০ টি, ফ্রান্সের ১৩৪ টি, ব্রিটেনের ৪৮ টি আর বেলজিয়ামের মোট ২৪ টি। কিন্তু যুদ্ধচলাকালীন মাত্র পাঁচ (২৮ জুলাই, ১৯১৪- ১১ নভেম্বর, ১৯১৮) বছরের ভেতরেই ব্রিটেন একাই প্রায় ৭৫,০০০ টি যুদ্ধবিমান তৈরি করে ফেলে! যে প্রযুক্তি তৈরি হয়েছিলো মানুষের কল্যানে তা সে সময় ব্যবহৃত হয়েছিলো মানুষকে ধ্বংশের কাজে।তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিমান ব্যবহার করে সফলতা লাভের পর বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী এ সেক্টরে আগ্রহী হয়। এতে লাভের ভেতরে যা হয় তা হলো, এভিয়েশন সেক্টরে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে লাগলো। এ সেক্টরে সর্বাধিক উন্নতি হয় ১ম বিশ্বযুদ্ধ ও ২য় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে। রাতারাতি আধুনিক যুগে প্রবেশ করে এভিয়েশন সেক্টর। তবে যে স্বপ্ন মানুষ লালন করেছিলো মানব কল্যাণের জন্য সেই স্বপ্নই ব্যবহার করা হয় মানবজাতিকে ধ্বংস আর ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে।

22

ছবি- আধুনিক যুদ্ধবিমান

 

মানুষের আজন্ম সাধ আকাশে ওড়া, এত সহজে আর সাবলীলভাবে সম্ভব হয়নি। এর জন্য দিতে হয়েছে প্রচুর সময় আর ধৈর্য। বিভিন্ন পরীক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে অগণিত মানুষ। তাদের অনেকের এই আত্মত্যাগের কথা আমরা আজ হয়তো জানিই না! তাদের এ আত্মত্যাগের ফলেই এভিয়েশন পৌছুতে পেরেছে আজকের অবস্থানে। তবে আজও আমাদের ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা। এর ভেতর গতি সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতাই বেশি। এছাড়া আরো অনেক স্বীমাবদ্ধতাই রয়েছে। এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়াররা এসব সীমাবদ্ধতা সমাধানে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আশা করা যায় কোন একদিন আমরা এসব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সক্ষম হব।

 

 

তথ্যসূত্র :

  1. Historical Development of Aircraft ( S.M. Anwarul Aziz)
  2. www.Wikipedia.com
  3. www.aerosociety.com
  4. গ্রীক মিথ (জামশেদ ফরেজী)
  5. Pioneers of aviation : 17Th Century Flight In Istanbul (www.lostislamichistory.com)
  6. উড়োজাহাজ কেমন করে উড়ে (এ. কে. এম. আতাউল হক)